নুরা পাগলার দরবারে বর্বরতা হামলা সংঘর্ষে খাদেম নিহত

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩১ এএম

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরা পাগলার দরবার শরিফে হামলা-ভাঙচুর ও লাশ পোড়ানো কেন্দ্র করে সংঘর্ষে রাসেল মোল্লা (৩০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। নারী ও পুলিশসহ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দফায় দফায় দরবারে হামলা করে ‘ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে একদল লোক। তারা শরিয়ত-পরিপন্থীভাবে দাফনের অভিযোগ তুলে নুরা পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেন। সেখানে পুলিশের দুটি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার এ ঘটনাকে অমানবিক ও ঘৃণ্য বলে উল্লেখ করে বলেছে, ‘এ ধরনের বর্বরতা কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নিজ বাড়িতে অনেক বছর আগে দরবার শরিফ গড়ে তোলেন নুরুল হক। গত ২৩ আগস্ট বার্ধক্যের কারণে মারা যান তিনি। ওইদিন রাতে মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে বিশেষ কায়দায় তার লাশ দাফন করেন ভক্তরা। এরপর বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কবর সমতল করাসহ কয়েকটি দাবি জানায় স্থানীয় আলেম সমাজ।

এ নিয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি ও নুরা পাগলার পরিবারের সদস্যদের কয়েক দফায় বৈঠক হয়। তবে কবর নিচু না করায় দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয় ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি। তারা বৃহস্পতিবারের মধ্যে কবর সমতলসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। অন্যথায় শুক্রবার জুমার পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ ও পরে ‘মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দুুপুর ২টার পর আনসার ক্লাব চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি। সেখানে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন শত শত মানুষ। আড়াইটার দিকে হাতুড়ি, শাবল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল লোক মিছিল নিয়ে আসে। এ সময় আয়োজকদের পক্ষ থেকে লাঠিসোঁটা, হাতুড়ি মঞ্চে জমা দিতে বলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে মঞ্চে বক্তব্য চলাকালে কিছু লোক পুলিশের ওপর হামলা করে দুটি গাড়ি এবং ইউএনওর গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় পুলিশের ছয় সদস্য আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বেলা ৩টার দিকে মঞ্চ থেকে ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা জালাল উদ্দিন প্রামাণিক, সদস্য সচিব বিএনপি নেতা আইয়ুব আলী খান সবাইকে সমাবেশে থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু উত্তেজিত লোকজন মিছিল নিয়ে নুরা পাগলার দরবারে হামলা করে। ভেতর থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন নুরা পাগলার ভক্তরা। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ সংঘর্ষে দুপক্ষের অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। কিছু লোক দরবারের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মালামাল লুটপাট করে। একপর্যায়ে বিকেল ৫টার দিকে নুরা পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে গোয়ালন্দ পদ্মার মোড়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ওপর নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানিয়েছে, রাসেল মোল্লা নামে একজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ফরিদপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। নিহত রাসেল ওই দরবারের খাদেম ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা।

পুলিশ সুপার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখানে পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী রয়েছে। হামলার ঘটনায় হতাহতের সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই।’

ইউএনও মো. নাহিদুর রহমান জানান, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দরবার। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সতর্ক রয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা জানা না থাকলেও শুনেছেন একজন মারা গেছেন। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।

এ ধরনের বর্বরতা কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না : নুরা পাগলার কবর অবমাননা ও মরদেহে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার বলেছে, ‘এ অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজটি আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের আইন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্যসমাজের মৌলিক ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত।’

গতকাল রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ ধরনের বর্বরতা কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের পবিত্রতা, জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

এ জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত এবং আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। যারা এই ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

দেশের নাগরিকদের প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, ‘সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন এবং ন্যায়বিচার ও মানবতার আদর্শকে সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গড়ে তুলুন।’

রাজশাহীতে খানকা শরিফে হামলা : রাজশাহী থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, একই দিন পবা উপজেলার বড়গাছি ইউনিয়নের পানিশাইল চন্দ্রপুকুর গ্রামে আজিজুর রহমান ভান্ডারী প্রতিষ্ঠিত ‘হক বাবা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী গাউছিয়া পাক দরবার শরিফ’ নামের খানকায় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই খানকায় মাদকের আখড়া গড়ে তোলা হয়েছিল এবং প্রকাশ্যে গাঁজাসহ নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন ও অনৈসলামিক কার্যক্রম চলত। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিন দিনের মিলাদে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ ও ভান্ডারী-মুর্শিদী গানের আয়োজনের খবরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। জুমার নামাজের পর বিক্ষুব্ধ জনতা খানকায় হামলা চালিয়ে টিনের ছাউনি ও বেড়া ভেঙে ফেলে, যাতে সেখানে আর মাদকের আখড়া না বসে। আজিজুর রহমান ভান্ডারী জানান, কয়েক দিন ধরে কিছু লোক অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছিল। তিনি থানায় অভিযোগ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পবা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, এলাকার অনেক মানুষ একত্রে হামলা চালিয়েছিল, যা পুলিশের পক্ষে থামানো সম্ভব হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজবাড়ী ও রাজশাহীর এ ঘটনাগুলোতে শরিয়তবিরোধী ও অনৈসলামিক কার্যক্রমের অভিযোগে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা সামাজিক উত্তেজনার চিত্র তুলে ধরে। তবে এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও সংঘর্ষে আহতদের বিষয়ে আরও তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত