পিতা হিসেবে যেমন ছিলেন নবীজি

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৪:৪৬ এএম

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি শুধু একজন মহান ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, বরং একজন পরম স্নেহময় পিতাও ছিলেন। তার পারিবারিক ও পিতৃত্বের দিকটি প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য অনুকরণীয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব ২১) এই আয়াতটি আমাদের শেখায়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ পিতা, যিনি সবকিছুর সঙ্গে সন্তানের নৈতিক, আত্মিক ও মানসিক বিকাশেও গুরুত্ব দিতেন। তিনি সন্তানদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখিয়েছেন, নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তার পিতৃত্বের মূল ভিত্তি ছিল ভালোবাসা, নৈতিকতা এবং আখেরাতের কল্যাণে উদ্বুদ্ধ করা।

পুত্র ও কন্যাদের প্রতি আচরণ : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাত সন্তান ছিলেন। তিন পুত্র (কাসেম, আবদুল্লাহ ও ইব্রাহিম) এবং চার কন্যা (জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা)। দুর্ভাগ্যবশত পুত্ররা শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। পুত্র ও কন্যা সবার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়।

পুত্র ইব্রাহিম (রা.) : হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইব্রাহিম (রা.) যখন দুধমাতার কাছে থাকতেন, তখন নবীজি (সা.) শুধু তাকে দেখার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন, তাকে কোলে তুলে নিতেন, চুমু খেতেন। (সহিহ মুসলিম) ইব্রাহিম (রা.) শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় নবীজি (সা.)-এর হৃদয়ে গভীর বেদনা সৃষ্টি হয়। তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে একজন সাহাবি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা হলো রহমত। এরপর তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই চক্ষু অশ্রু ঝরাচ্ছে এবং হৃদয় বিগলিত হচ্ছে। তবে আমরা মুখে কেবল তাই বলব, যা আমাদের রব পছন্দ করেন। তোমার বিরহে আমরা বড়ই ব্যথিত হে ইব্রামিম! (সহিহ বুখারি) এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সমর্পিত থাকা সত্ত্বেও একজন পিতার হৃদয়ে সন্তানের জন্য কত গভীর ভালোবাসা থাকতে পারে। নবীজি (সা.) কন্যাদের প্রতিও সমান ভালোবাসা পোষণ করতেন।

জয়নব (রা.) : বদরের যুদ্ধে তার স্বামী আবুল আস ইবনে রবি বন্দি হলে জয়নব (রা.) তাকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণ হিসেবে একটি হার পাঠান, যা তার মা খাদিজা (রা.) তাকে বিবাহের সময় দিয়েছিলেন। হারটি দেখে নবীজি (সা.)-এর মন এতটাই বিগলিত হয় যে, তিনি সাহাবিদের অনুরোধ করেন যেন আবুল আসকে মুক্তি দিয়ে হারটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সাহাবিরা সানন্দে তা করেন। (সুনানে আবু দাউদ)

রুকাইয়া (রা.) : বদরের যুদ্ধের সময় রুকাইয়া (রা.) গুরুতর অসুস্থ হলে নবীজি (সা.) তার স্বামী ওসমান (রা.)-কে যুদ্ধে না গিয়ে স্ত্রীর সেবা করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ওসমান (রা.) যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও বদরের মুজাহিদদের সমান সাওয়াব পাবেন।

উম্মে কুলসুম (রা.) : তৃতীয় কন্যা উম্মে কুলসুম (রা.)-এর ইন্তেকালের পর নবী করিম (সা.) তার কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকতেন। তার চোখ থেকে তখন অবিরাম অশ্রু ঝরত। (সহিহ বুখারি)

ফাতেমা (রা.) : নবীজি (সা.)-এর সবচেয়ে ছোট কন্যা ফাতেমা (রা.)-এর প্রতি তার ভালোবাসা ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি ফাতেমাকে ‘আমার দেহের অংশ’ বলে সম্বোধন করতেন এবং বলতেন যে, ফাতেমাকে যে কষ্ট দেয়, সে যেন আমাকেই কষ্ট দেয়। যখন ফাতেমা (রা.) আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাতেন, তার হাত ধরে চুমু দিতেন এবং নিজের আসনে বসাতেন।

আধ্যাত্মিক শিক্ষা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সন্তানদের জাগতিক আরাম-আয়েশের চেয়ে আখেরাতের কল্যাণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ফাতেমা (রা.)-এর জীবন। দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যে তিনি জীবনযাপন করতেন। তিনি নিজ হাতে জাঁতা চালাতেন, রুটি তৈরি করতেন, পানি টানতেন এবং ঘর ঝাড়– দিতেন। এতে তার হাতে ফোসকা পড়ত এবং গায়ে দাগ বসে যেত। একবার নবীজি (সা.)-এর কাছে গনিমতের মাল এবং কিছু গোলাম এলে ফাতেমা (রা.) একজন খাদেমের জন্য আবেদন করেন। একজন পিতার জন্য তার কন্যার এমন কষ্টের কথা শোনা কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু নবীজি (সা.) কী করলেন? তিনি তাদের ঘরে এসে শেখান যে, রাতে ঘুমানোর আগে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়া একজন খাদেমের চেয়ে উত্তম। এই শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) তার সন্তানদের আল্লাহর নৈকট্য লাভে উৎসাহিত করতেন, জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্যে নয়। ফাতেমা (রা.) এই উপদেশ শুনে সন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি সন্তুষ্ট।’ (সহিহ মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের জন্য একজন আদর্শ পিতার সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। তার পিতৃত্ব ছিল ভালোবাসা, ধৈর্য, নৈতিক শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনুপম সমন্বয়। তিনি শিখিয়েছেন, একজন সফল পিতা তিনিই, যিনি শুধু সন্তানের দৈহিক প্রয়োজন মেটান না, বরং তাদের হৃদয় ও আত্মাকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং আখেরাতের কল্যাণের দিকে পরিচালিত করেন। তার আদর্শ মেনে চললে আমরা একটি সুশৃঙ্খল, নৈতিকতাপূর্ণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারী পরিবার গড়ে তুলতে পারব ইনশাআল্লাহ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত