ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ ভোট উৎসব। ছয় বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলমান অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ নির্বাচন হচ্ছে বলে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে, এমনটা মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকার। উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘হাজারো শিক্ষার্থীর আশা-আকাক্সক্ষার মধ্যে ১১ মাসের দীর্ঘ প্রস্তুতির পর নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আমরা আজ চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি।’
উপাচার্য এ নির্বাচনের প্রার্থীদের একে অন্যের প্রতি সহনশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘হার-জিত যাই হোক, আমাদের মধ্যে এমন কিছু নেই যাতে বড় কোনো সংঘাত তৈরি হয়।’ তারপরও কেউ আইন ভঙ্গ করলে প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
সাইবার আক্রমণের অভিযোগ : নির্বাচনে প্রধান কয়েকটি প্যানেলের মধ্যে অন্তত দুটি, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ভোট সামনে রেখে ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সাইবার আক্রমণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছে। ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মো. আবিদুল ইসলাম খান, জিএস প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম ও এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী এমন অভিযোগ করেন। আবিদ মধুর ক্যান্টিনে প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করেন, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরে নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কায় একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এ কাজ করেছে। সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগও করেন তিনি।
ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্যানেলের জিএস প্রার্থী এসএম ফরহাদের অভিযোগ, এ প্যানেলের প্রার্থীদের ফেসবুক আইডিগুলোয় ক্রমাগত সাইবার আক্রমণ হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা নেই : চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা
ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। সোমবার ডাকসু নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি করেন। তিনি ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে গুজবে কান না দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান। জসীম উদ্দিন আবাসিক ও অনাবাসিক সব শিক্ষার্থীকে ভোট দিতে আসার অনুরোধ জানান।
ঢাবি প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি প্রবেশপথে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা চৌকি। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, মোবাইল প্যাট্রল, ডগ স্কোয়াড, বিশেষায়িত টিম, বম্ব এক্সপোজাল ইউনিট, সোয়াত টিম, সাদা পোশাকে ডিবি, সিসিটিভি মনিটরিং সেল ও স্ট্রাইকিং রিজার্ভ নিয়োজিত রয়েছে।
আটটি কেন্দ্রে ৮১০টি বুথে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। যদি বিকেল ৪টার সময়ও কেউ ভোটকেন্দ্রের সামনে অবস্থান করেন, তাহলে তাদেরও সুযোগ দেওয়া হবে।
নির্বাচনে প্রতি ভোটারের জন্য একটি করে ছয় পৃষ্ঠার ওএমআর ফরম ব্যবহার হবে। এর মধ্যে পাঁচ পৃষ্ঠা কেন্দ্রীয় সংসদ এবং এক পৃষ্ঠা হলো সংসদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। এতে প্রার্থীদের নাম, ব্যালট নম্বর, পদবির নাম এবং ভোট দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ঘর থাকবে। প্রার্থীর নামের পাশের বর্গাকৃতির ঘরে ক্রস চিহ্ন আকার মাধ্যমে ভোট দেবেন ভোটাররা।
ভোটগ্রহণ শেষে তাৎক্ষণিকভাবে ভোট গণনা হবে ১৪টি অত্যাধুনিক স্ক্যানিং মেশিনে। নবাব নওয়াব আলী সিনেট অডিটরিয়ামে ফল প্রকাশ করা হবে।
ভোটারদের সুবিধার্থে চক্রাকার শাটল
শিক্ষার্থীরা যেন আজ নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন, সেই লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে বিশেষ চক্রাকার শাটল সার্ভিস চলবে। আজ সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত শাটল সার্ভিস চলবে।
কত ভোটার, কত প্রার্থী
নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০ হাজার ৮৭৩ জন। ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯০২ জন।
ডাকসুর ২৮টি পদে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৭০ জন প্রার্থী। নারী প্রার্থী ৬২ জন। সহসভাপতি (ভিপি) পদে ৪৫, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৯, সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ৬২ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ভিপি পদে ৫, জিএস পদে ১, এজিএস পদে ৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ১৮টি হলের প্রতি হল সংসদে ১৩টি করে মোট ২৩৪টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ১০৮ জন।
এলইডি স্ক্রিনে দেখা যাবে গণনা, ফলাফল
ভোটগ্রহণ শেষে ভোট গণনা করা হবে অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) মেশিনে। প্রত্যেক কেন্দ্রের বাইরে এলইডি স্ক্রিনে ফল গণনা প্রদর্শিত হবে। প্রত্যেক কেন্দ্রের ফল সেখানেই ঘোষণা করা হবে, পাশাপাশি স্ক্রিনেও দেখা যাবে। সবশেষে সিনেট ভবন মিলনায়তনে সব কেন্দ্রের মোট ফল ঘোষিত হবে। তবে এর আগেই সব কেন্দ্রের ফল যোগ করে যে কেউ মোট ফলাফল বের করতে পারবেন।
