ইউক্রেনে স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য যুদ্ধ করছি

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:৩৯ এএম

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ ইউক্রেনের বাসিন্দা। তিনি পিএইচডি হোল্ডার, ২০ বছর ইমামতি করেছেন, উম্মাহ সংগঠনের মুফতি হিসেবে ১৩ বছর কাজ করেছেন। বর্তমানে সামরিক বাহিনীতে লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। মাতৃভূমি রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে। ধর্মীয় দায়িত্ব, মানবিক কর্তব্য এবং জাতীয় স্বার্থকে একসূত্রে গেঁথেছেন তিনি। যাপিত জীবন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের দুঃসহ বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। অনলাইনে সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও ভাষান্তর করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

দেশ রূপান্তর : আপনার জন্ম, বেড়ে উঠা ও মা-বাবা সম্পর্কে বলুন।

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : আমার জন্ম দোনেৎস্ক শহরের ভলগা তাতার পরিবারে। বর্তমানে এই এলাকাটি রুশ সেনাদের দখলে রয়েছে। যদিও আমরা পূর্ব থেকেই মুসলমান ছিলাম, কিন্তু আমার পরিবার সোভিয়েত ইউনিয়নের অধিকাংশ মুসলমানের মতোই নামাজ ও কোরআন পড়তে জানত না। কারণ সোভিয়েত শাসনামলে ধর্ম পালন ও ধর্মীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। আমার বাবা-মা ছিলেন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। বাবা ছিলেন কয়লা খনির শ্রমিক আর মা কাজ করতেন প্ল্যান্ট বেকারিতে।

দেশ রূপান্তর : পড়াশোনা করেছেন কোথায়?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : ২০০১ সালে মস্কোর ইসলামিক ইউনিভার্সিটির শরিয়াহ অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করি। এরপর দোনেৎস্কে ফিরে আসি। তখন ইউক্রেনিয়ান ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিই। এক বছর শিক্ষকতা করার পর দোনেৎস্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করি। এরপর ‘সুন্নি ও শিয়া ইসলামে শরিয়াহ : একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ’ বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করি।

দেশ রূপান্তর : আপনি দেশের হয়ে যুদ্ধ করছেন, এ বিষয়ে আপনার পরিবারের অভিব্যক্তি কী?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : সেনাবাহিনীতে আমার যোগদান এবং মাতৃভূমি রক্ষার সিদ্ধান্তকে আমার পরিবার সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করে। কারণ এই যুদ্ধ প্রতিটি ইউক্রেনীয়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মূলত একটি জাতি হিসেবে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছি। আর এটি আমাদের প্রত্যেকের জন্যই প্রযোজ্য, যা ইউক্রেনীয় মুসলমানদেরও অন্তর্ভুক্ত করে।

দেশ রূপান্তর : আপনি দীর্ঘদিন মসজিদে ইমামতি করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : অমুসলিম সমাজে ইমাম হওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ এবং বড় দায়িত্ব। ইউরোপে আমরা শুধু ইসলাম পালনই করি না, বরং অমুসলিমদের কাছেও আমাদের ধর্মকে উপস্থাপন করি। যদিও এটি সহজ কাজ নয়, তবুও ইউক্রেনীয় মুসলমানরা গত কয়েক শতাব্দী ধরে এভাবেই জীবনযাপন করে আসছে।

দেশ রূপান্তর : আপনি মুফতি হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মানুষ কোন বিষয়ে ফতোয়া নেওয়ার জন্য বেশি আসত?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : আমার কাছে যে প্রশ্নগুলো সবচেয়ে বেশি আসত, সেগুলো মূলত হালাল খাদ্য সম্পর্কিত ছিল। পাশাপাশি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বিয়ে ও তালাক সম্পর্কিত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দেশ রূপান্তর : কী চিন্তা থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন? সামরিক বাহিনীতে আপনার পদবি কী?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা চালায় তখন আমি পরিবার নিয়ে বুচা শহরে বসবাস করি। রুশ আগ্রাসীরা এখানে বেসামরিক লোকদের ওপর গণহত্যা চালায়। আগ্রাসনের প্রথম দিনেই আমি পরিবারকে বুচা শহর থেকে সরিয়ে নিই, তখন আমাদের বাড়ির কাছেই সামরিক অভিযান চলছিল। দ্বিতীয় দিনে রুশ সেনারা শহরটি দখলে নিলে আমিও বাধ্য হয়ে কিয়েভে চলে যাই।

সেখানে আমি হসপিটালার্স মেডিকেল ব্যাটালিয়নে যোগ দিই। একজন ফার্স্ট রেসপন্ডার হিসেবে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান এবং বেসামরিক ও সামরিক লোকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করি। যুদ্ধে অংশগ্রহণে আমার প্রেরণা ছিল আহত ইউক্রেনীয়দের জীবন বাঁচানো। মুসলিম হিসেবে আমি এটিকে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ হিসেবে দেখি।

দেড় বছর স্বেচ্ছাসেবী প্যারামেডিক হিসেবে কাজ করেছি। আমাদের দলটি মুসলমানদের নিয়ে গঠিত ছিল। আমরা শত শত আহতকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি। ২০২৩ সালে আমাকে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়মিত সৈনিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিছুদিন এয়ার ডিফেন্স ইউনিটে দায়িত্ব পালনের পর আমাকে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয় এবং স্ট্রাইক ইউএভি ব্যাটালিয়নে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে আমি আবারও সামরিক প্যারামেডিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমাকে লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে আমি সেকেন্ড মেডিকেল ব্যাটালিয়নে মোতায়েন আছি।

দেশ রূপান্তর : আপন মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য কতজন মুসলিম নাগরিক ইউক্রেনের হয়ে যুদ্ধ করছেন? তারা কী প্রত্যাশা নিয়ে যুদ্ধ করছেন?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীতে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করা মুসলমানের সংখ্যা ২০ হাজার। আমরা যুদ্ধ করছি আমাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ মুক্ত করার জন্য এবং স্বাধীন দেশের স্বাধীন মুসলিম হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য। রাশিয়ার দখলদারত্বে বসবাস করার কোনো আকাক্সক্ষা ইউক্রেনের মুসলমানদের নেই। তা ছাড়া রাশিয়ায় মুসলিম নাগরিকদের প্রতি যে আচরণ করা হয়, তা ইউক্রেনের তুলনায় অনেক নিম্নমানের। আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে ভালোবাসি এবং এর মূল্য দিই।

দেশ রূপান্তর : ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে জালেম কে আর মজলুম কে?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : এটি সুস্পষ্ট যে, রাশিয়ান ফেডারেশনই আগ্রাসী ও জালেম। এখানে রুশ সেনারা নির্মম গণহত্যা চালাচ্ছে। তারা বলপ্রয়োগে যেসব অঞ্চল দখল করেছে, সেখান থেকে ইউক্রেনের মুসলিম-অমুসলিম সব জনগণকে উচ্ছেদ করছে। এখন ইউক্রেনের সবাই উচ্ছেদ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া রুশ সেনারা আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো সন্ত্রাস সৃষ্টি করা, যাতে ইউক্রেনীয়রা ভয় পেয়ে প্রতিরোধ ছেড়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একমাত্র রাশিয়াই নজিরবিহীনভাবে একটি স্বাধীন ইউরোপীয় রাষ্ট্রে আক্রমণ করেছে। পারমাণবিক বোমা ছাড়া তাদের হাতে থাকা প্রতিটি অস্ত্র ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনী আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে বীরোচিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং আমাদের দেশ ও জনগণকে নিশ্চিহ্ন হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

দেশ রূপান্তর : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের জন্য কাজ করছেন। এটা কি ফলপ্রসূ হবে?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : আমি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপক প্রচারিত ‘শান্তি স্থাপন’ প্রচেষ্টার মধ্যে কোনো কার্যকারিতা দেখছি না। তার কোনো কর্মকাণ্ডই ইউক্রেনের জনগণের পরিস্থিতি উন্নত করছে না, বরং এটি আরও জটিলতাকে তীব্র করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার আগ্রাসন রোধ, ইউক্রেনকে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা প্রদান এবং রাশিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপে অনেক বেশি দৃঢ় ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এগুলোর কোনোটিই করছেন না। তার বক্তব্য অসার কথাবার্তা ছাড়া আর কিছু নয়।

দেশ রূপান্তর : যুদ্ধক্ষেত্রে ইবাদত-বন্দেগি কীভাবে করেন?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে নিয়োজিত মুসলমানরা নামাজ, রমজান মাসে রোজা এবং শুক্রবার ও ঈদের নামাজে অংশগ্রহণের অধিকার উপভোগ করছেন। ছয়জন মুসলিম সামরিক ধর্মপ্রচারক ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন। তারা মুসলিম সৈনিকদের জন্য নামাজ, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন। বর্তমানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হালাল সামরিক রেশন তৈরির কাজ করছে, যাতে মুসলিম পুরুষ ও নারী সৈনিকরা ইসলামি নীতিমালা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : যুদ্ধ শেষে কি সামরিক বাহিনীতেই থেকে যাবেন? নাকি পূর্বের পেশায় ফিরে আসবেন?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : আমি এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি, আমাদের বিজয়ের পর আমি কী করতে চাই। একবিংশ শতাব্দীতেও সত্যিকারের সামরিক অভিযানে থাকার বিষয়টি একদিন একদিন করে বাঁচতে শেখায়। আমি পরবর্তী নামাজের জন্য জীবিত থাকা নিয়ে খুশি, তা সকাল হোক, দুপুর বা রাত। এটি মহান আল্লাহর অনন্ত করুণা। কারণ আমার অনেক সহযোদ্ধা মুসলিম সৈনিক পরবর্তী নামাজ পর্যন্ত বাঁচতে পারেন না। হাদিসে যেমন বলা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা ঠিক তেমন জীবনযাপন করি। যখন আমরা ঘুমাই, আমরা সকাল পর্যন্ত বাঁচব বলে আশা করি না। আবার ঘুম থেকে উঠার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁচব বলে আশা করি না। সাধারণ জীবনযাপনে এই হাদিসের পূর্ণ গভীরতা বোঝা কঠিন। কিন্তু যুদ্ধে এটি সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায়।

দেশ রূপান্তর : তরুণদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে আপনার পরামর্শ কী?

মুফতি সাঈদ ইসমাইলুফ : আমার পরামর্শ হলো, সবাই যেন ইমানকে আঁকড়ে ধরে, সাহসী ও দৃঢ় থাকে। আল্লাহর ওপর আস্থা বিপর্যয়ে শক্তি জোগায়। একজন বিশ্বাসী আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা রাখে, যা কোনো বিপর্যয় সহ্য করার প্রধান শক্তির উৎস। আমাদের উচিত সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ভালোবাসা এবং তিনি যেসব উপহার দিয়েছেন, যেমন আমাদের মাতৃভূমি, পরিবার ও জনগণকে ভালোবাসা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত