বিশ্বসাহিত্যে যে কয়টি মহাকাব্য রচনাশৈলী, ব্যপ্তি ও গুরুত্বানুসারে অমর হয়ে আছে শাহনামা তার মধ্যে অন্যতম। শাহনামা শব্দের অর্থ রাজা-বাদশাদের কাহিনি। গজনীর বাদশা সুলতান মাহমুদ মহাকবি ফেরদৌসীকে ইরানের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে একটি মহাকাব্য রচনা করতে অনুরোধ করেন। এসব ইতিহাস ইরানের লোকসাহিত্যে মানুষের মুখে মুখে ফিরত। প্রাচীন এই ইতিহাসকে অমরতাদানের জন্যই তিনি মহাকবি ফেরদৌসীকে এই অনুরোধ করেন। ফেরদৌসী কবির প্রকৃত নাম নয়। তার প্রকৃত নাম আবুল কাসেম। গজনী থেকে অনেক দূরে তুস নগরে তার জন্ম। ফেরদৌসী (আবুল কাসেম) ছোটবেলা থেকেই ছিলেন প্রতিভাবান। মুখে মুখেই তিনি কবিতা রচনা করতে পারেন। তার রচিত সেসব কবিতা মানুষ পছন্দও করত ভীষণভাবে। কিন্তু শুধু প্রশংসা দিয়ে তো আর পেট ভরে না। ফেরদৌসী নিজে ছিলেন গরিব ঘরের সন্তান। তার কবিতার সমজদারও কেউ তেমন ধনী ছিলেন না। নিজের প্রতিভার সমাদরের জন্য কবি ঠিক করলেন তিনি রাজধানীতে যাবেন, রাজদরবারে যাবেন। নানা বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে ঠিকই তিনি রাজদরবারে এলেন এবং নিজের কাব্যপ্রতিভা ও বুদ্ধির জোরে রাজা সুলতান মাহমুদের মনে একটি স্থায়ী আসন অধিকার করতে সক্ষম হলেন। তার কাব্যপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বাদশা সুলতান মাহমুদ তাকে ‘ফেরদৌসী’ উপাধি দেন। সেই থেকে কবি আবুল কাসেম ‘ফেরদৌসী’ নামেই পরিচিত ও বিখ্যাত হলেন। শাহনামা রচনার ঘটনা এবং রচনার পরে মহাকবি ও বাদশাহর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব শুরু হয় সেটিও শাহনামায় বর্ণিত ঘটনার থেকে কম আকর্ষণীয় নয়। সেটিও ইতিহাসে অমর অক্ষয় হয়ে আছে। শাহনামার প্রসঙ্গ এলেই অবধারিতভাবে চলে আসে ফেরদৌসী ও সুলতান মাহমুদের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব এবং শাহনামায় বর্ণিত রাজরাজড়াদের কাহিনি গদ্যাকারে সংক্ষিপ্ত ও শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে লিখেছেন সুসাহিত্যিক হালিমা খাতুন। তার রচিত ‘শাহনামা’ বইটি ইরানের ভুবনবিখ্যাত বীর ও রাজরাজড়াদের বীরত্ব তুলে ধরেছে।
বাদশাহ সুলতান মাহমুদের সেই প্রস্তাবে (ইরানের ইতিহাস নিয়ে মহাকাব্য রচনার প্রস্তাব) মহাকবি ফেরদৌসী এক শর্তে রাজি হন, শর্তটি হলো, তাকে প্রতিটি পঙ্ক্তি বা শ্লোকের জন্য একটি স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে। বাদশাহ তার এই শর্তে রাজি হন। সেদিনের পর থেকে ফেরদৌসী শুরু করলেন মহাকাব্য রচনা। দীর্ঘ ত্রিশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে সমাপ্ত হয় এই কর্মযজ্ঞ। ফেরদৌসী রাজার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণে অনেকেই নাখোশ ছিল কবির ওপর। তারা কবির ওপর বাদশার মন বিষিয়ে দিতে নানা রকম প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। রাজদরবার থেকে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার (মহাকাব্য রচনার জন্য) কারণে তারা এই সুযোগটি পায়। তারা বাদশাকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, একটি শ্লোকের জন্য এক স্বর্ণমুদ্রা অনেক বেশি। তাদের কথা মেনে বাদশা ফেরদৌসীকে এক শ্লোকের জন্য এক রৌপ্য মুদ্রা হিসেবে ষাট হাজার শ্লোকের জন্য ষাট হাজার রৌপ্য মুদ্রা পারিশ্রমিক দেন। কিন্তু আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ফেরদৌসী সে অর্থগ্রহণ না করে তা নিজের দাসদাসীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এ কথা শুনে বাদশা রেগে যান এবং তাকে বন্দি করতে আদেশ দেন। ফেরদৌসী মনের দুঃখে ইরান থেকে পালিয়ে যান। পরে অবশ্য বাদশা নিজের ভুল বুঝতে পারেন। সেই ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রাসহ আরও বহু উপহার দিয়ে নিজের কর্মচারী পাঠান ফেরদৌসীর কাছে। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। অর্থাভাবে ও মনের দুঃখে ফেরদৌসী অসুস্থ হয়ে যান এবং পরে মারা যান। সুলতানের কর্মচারীরা যখন পৌঁছে তখন দেখা যায় যে, ফেরদৌসীকে কবরস্থ করতে বের করা হচ্ছে বাড়ি থেকে। এই অর্থ কবির পরিবারকে দিতে চাইলে ফেরদৌসীর কন্যা তা প্রত্যাখ্যান করেন। রাজরাজড়াদের জীবনকে অমর করে দেওয়া মহাকবি রাজার মতোই মাথা উঁচু করে জীবনাবসান করেন। নিজেও রাজরাজড়ার কাতারভুক্ত হন।
শাহনামার কথা উঠলেই সবার প্রথমে যেটি মনে আসে তা হলো, সোহরাব-রুস্তমের গল্প। রুস্তম ছিলেন ইরানের কিংবদন্তিতুল্য বীর সামের পৌত্র এবং আরেক বিখ্যাত বীর জালের পুত্র। বাদশাহর নির্দেশে তুরান দেশে অভিযানে গেলে সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় এক সামন্তকন্যা তাহমিনার সঙ্গে। তাদের বিবাহ হয় এবং তাহমিনা গর্ভধারণ করেন। মাতৃভূমির ডাকে রুস্তমকে ইরানে ফিরে আসতে হয়। আসার সময় তিনি তাহমিনাকে একটি তাবিজ দিয়ে বলেন, পুত্র হলে বাহুতে এবং কন্যা হলে চুলে বেঁধে দিতে। তাহমিনা যথাসময়ে একটি পুত্রসন্তান জন্ম দিলেও রুস্তমকে খবর পাঠান যে, কন্যাসন্তান হয়েছে। তার ভয় ছিল, পুত্রসন্তান হয়েছে জানলে রুস্তম তাকে নিজের কাছে নিয়ে যাবেন। এই একটি মিথ্যাই তাকে সন্তানহারা করে। রাজনীতি ও রাজাবাদশার সীমাহীন লোভ ও কুটিলতা কীভাবে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে তার একটি উদাহরণ সোহরাব-রুস্তম উপাখ্যান। এই গল্পটি এতই জনপ্রিয় যে, বহু যাত্রাপালা ও কাহিনি রচিত হয়েছে এই কাহিনির ওপরে ভিত্তি করে। শাহনামার অন্য গল্পগুলোও যেমন শিক্ষণীয় তেমনি আকর্ষণীয়। ষাট হাজার শ্লোকের বিশাল মহাকাব্য পড়তে না পারলেও খুব সহজেই হালিমা খাতুন রচিত ‘শাহনামা’ পড়ে জানতে পারো হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা ইরানের প্রাচীন ইতিহাসের রাজাদের কাহিনি। বইটি তোমাদের ভালো লাগবে।
সুলতানা রাজিয়া
