আধুনিকতার ছোঁয়াতে আমাদের হারিয়ে গেছে জীবন ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা অনেক জিনিস। বিশে^র অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও তথ্য-প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার জীবনযাপনে নিয়ে এসেছে পরিবর্তন। আশি বা নব্বই দশকে যে যন্ত্রগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, একবিংশ শতাব্দীতে সবই এখন কালের গর্ভে বিলীন।
বাঙালি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, বাংলার যা ভালো তা ভালো বলে জানা আর যা মন্দ তা মন্দ বলে জানা। ভালো-মন্দ বেছে নেওয়া নিজের কাজ। কিন্তু জানাটা প্রত্যেক বাঙালির দরকারি কাজ। আবার কালের বিবর্তনে যা যা বদলাচ্ছে, তাও দেখতে হবে।
একদিকে দেশের আধুনিকতায় পরিবর্তন, অন্যদিকে হারিয়ে ফেলা দেশের ও সভ্যতার ইতিহাস। যেমন এখন আর রেডিও নিয়ে কেউ খবর শোনার অপেক্ষায় থাকে না, সন্ধ্যা হতেই গ্রামে গ্রামে হারিকেন জ¦লে না, ঢেঁকির শব্দে মুখরিত হয় না হেমন্তের ধান ভানার উৎসব, লাঙ্গল নিয়ে পরিবারের কেউ মাঠে যায় না, পানীয় পান করার জন্য রুপা বা তামার পাত্র ব্যবহার করে না ও কাঁসার থালায় ভাত খেতেও দেখা যায় না। এ ছাড়াও কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে শত বছরের পুরনো পিতলের লোটা, অর্ধশত বছর আগের টেপ রেকর্ডার, পালকি, পায়ের খড়ম, মাটির পাতিল, পিঠা তৈরির সরঞ্জাম, মাটির চুলা, সুপারি কাটার যাঁতি, হারিকেন, বিউগল, কয়লার ইস্ত্রি, হুঁকো, মাটির পুতুল, পুরনো টাইপ রাইটার মেশিন, গ্রামোফোন, হাসন রাজার পঙ্খীরাজসহ আরও কত কী!
এ ছাড়াও হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় আরও যোগ হয়েছে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কৃষিজ সরঞ্জামাদি, রয়েছে মাছ ধরার ডরি, ঠেলাজাল, কোকা, পলোসহ নানা উপাদান। এ ছাড়াও বাঁশ-বেতের তৈরি খালুই, ঝাঁপি, চাইন, টুকরি আর কৃষকের মাথান। বাঙালি সংস্কৃতির সোনালি অতীত ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে। কালচক্রে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির কৃষ্টি-কালচার ও সংস্কৃতি উৎসব। একযুগ আগেও গ্রামীণ জনপদে নানা ধরনের উৎসবের আয়োজন করা হতো। জারি, সারি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া গান, গাজীর গীত, বিয়ের গীত, বিচার গান, কবি গান, ভাব গান, পালা গান, ধোয়া গান, ভাটিয়ালি গান, যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, দাঁড়িয়াবান্ধা, বৌচি, গোল্লাছুট, ইচিং-বিচিং-চিছিং-ছা, এক্কাদোক্কা, মোরগ লড়াই, ঘোড়দৌড়, নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা এবং জাতীয় খেলা হা-ডু-ডুসহ নানা ধরনের আয়োজন করা হতো বিভিন্ন এলাকায়। এ ছাড়াও গেস্টরুম কিংবা ড্রয়িংরুমের আদি ভার্সন কাচারি ঘর, গ্রামের মানুষের তথ্যপ্রবাহ ও বিনোদনের মাধ্যম রেডিও এবং টেপরেকর্ডার, বিদ্যুৎবিহীন গ্রামের অন্ধকার দূর কারার অবলম্বন হারিকেন বা কুপিবাতির আলো আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্ম হয়তো এসব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সম্পর্কে জানবে না, পড়তে হবে ইতিহাস।
এখন আর আগের মতো শৈশবের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস-উল্লাসে মাতামাতি চোখে পড়ে না। বিশেষ করে নগর ও শহরের যান্ত্রিকতায় শৈশব জীবনে পড়েছে বিরূপ প্রভাব। তারা বোধহয় ভুলেই যাচ্ছে শৈশব মানে দুরন্তপনা, শৈশব মানে স্মৃতি ও স্বপ্ন সুখের উল্লাসে কাটানো সময়। শৈশবের সেই দুরন্তপনা এবং প্রকৃতির আলিঙ্গন থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে শহুরে প্রজন্ম। তারা পাচ্ছে না সোনালি রোদের ঝলমলে আলো, রোদেলা দুপুর, বর্ণিল মেঘের ছায়া, রংধনুর অপূর্ব দৃশ্য, নির্মল উতলা বাতাসের দমকা! চার দেয়ালের ভেতরে যেন বন্দিত্বের সব আয়োজন। এদিকে টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ভিডিও গেম এবং মোবাইল গেম রীতিমতো ভূতের বোঝা হয়ে চেপেছে শিশুদের মনে। তবে গ্রাম-গঞ্জে এখনো শৈশবে মেতে ওঠার নানা চিত্র চোখে পড়ে। ডাক দিয়ে যায় দুরন্ত শৈশব।
জন্মভূমি, মা আর মাতৃভাষা এ নিয়েই চলে বহমান জীবনের নৌকা। গ্রাম নিয়ে ভাবতে গেলে একটা শান্তিময় অভিব্যক্তি ছুঁয়ে যায় দেহ মনে। সাপের মতো এঁকে বেঁকে হারিয়ে যাওয়া নদী, বিলে ফোটা শাপলা, মাছরাঙা পাখির হঠাৎ ছোঁ মেরে মাছ ধরার কৌশল, দূর আকাশে হঠাৎ ডেকে ওঠা চিল, সন্ধ্যা হলে পাখিদের চেঁচামেচিতে সরব বাড়ির পেছনের গা ছম ছম করা আঁধার জঙ্গল, হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসার জন্য বড়দের তাগিদ।
বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বিজাতীয় আগ্রাসন ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে স্বদেশি সুসমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শেকড় আজ মুখ থুবড়ে পড়ছে। অথচ এসব দেশীয় বিভিন্ন ধরনের আয়োজন সাজানো হতো রূপসী বাংলার গ্রামে গ্রামে। বিশেষ কোনো দিবস উপলক্ষে কিছু সংস্কৃতি আজও জানান দেয় বাঙালিয়ানার শিকড়ের মধুময় দিনগুলোর অস্তিত্ব। ঐতিহ্য হচ্ছে এমন কিছু, যা যুগ যুগ ধরে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকে থাকে। হতে পারে এটা কোনো অভ্যাস, আচার অনুষ্ঠান, প্রথা বা এমন কোনো স্থাপনা, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ঐতিহ্য মূলত আঞ্চলিক। ঐতিহ্য হলো, অতীতের গৌরবের বস্তু। অন্যভাবে বলা যায়, পরম্পরায় চলে আসা এমন কোনো চিন্তা বা বিশ্বাসই হলো ঐতিহ্য।
আর সংস্কৃতি হলো কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য এবং মনন। কোনো স্থানের মানুষের আচার, ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি, শিক্ষাদীক্ষা প্রভৃতির মাধ্যমে যা ব্যক্ত হয়, তা-ই সংস্কৃতি। মানুষই একমাত্র সংস্কৃতিবান প্রাণী। অন্যভাবে বলা যায়, সংস্কৃতি হলো, মানবসৃষ্ট এমন সব কৌশল বা উপায়, যার মাধ্যমে সে তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে।
পৃথিবীর প্রতিটি জাতি তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যায়। মূল উদ্দেশ্য থাকে প্রাচীন যুগের যেসব লোকসংস্কৃতি ছিল বা হারিয়ে গেছে সেটাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির যেসব উপকরণ আমাদের জীবনে একসময় অপরিহার্য ছিল, আজ তার কিছুটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিছুটা বিলুপ্তির পথে।
এদিকে জীবিকার তাগিদে মানুষ ছিটকে পড়ে, তার শিকড় ছেড়ে। গ্রাম ছেড়ে যেখানেই তার ঠিকানা হোক, সে কখনো ভুলতে পারে না গ্রামের কথা। পাড়ার বন্ধুরা, তাদের নিয়ে ছেলেবেলার সব কর্মকা-, স্মৃতির জাবরকাটায় উগরে দেয় ফেলে আসা জীবনের গচ্ছিত পদাবলি।
ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা, মানুষকে রোবট বানিয়ে দিচ্ছে দিনকে দিন। অথচ এটা ভুলে গেলে চলবে না, বাঙালির গৌরবময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কিন্তু ঠুনকো নয়, এটা আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। তাই তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকতার যুগে এসে আমরা আকাশ জয় করলেও আমাদের সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সবসময় বাঙালির হৃদয়ে দোলা দেয়। বাঙালির এই ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি যুগযুগান্তর ধরে টিকিয়ে রাখতে নিজেদের সচেতন হতে হবে, চর্চা করতে হবে নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্যের।
