সার আমদানিতে এক ব্যক্তিকে বিশেষ সুবিধা!

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:৫৫ এএম

বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে নন-ইউরিয়া সার আমদানি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় একের পর এক অনিয়মের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। এবার একজন ব্যক্তিকে ‘বিশেষ সুবিধা’ দিয়ে সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম ভেঙে একই কার্যাদেশে দুটি দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দরে একটি লটের সার আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার যোগসাজশে আমিনুর রশিদ খান নামের এক ব্যবসায়ীকে এ ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আমিনুর রশিদ খান কৃষি মন্ত্রণালয়ে ‘মামুন’ নামে পরিচিত।

এ বিষয়ে প্রবাসী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত জুলকারনাইন সায়ের গত ১১ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি কয়েকটি কোম্পানিকে দেওয়া কার্যাদেশের কপি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সার আমদানির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে, সম্প্রতি সার আমদানির জন্য আহ্বান করা দরপত্রের বিপরীতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।’

তার সে অভিযোগ আমলে নিয়ে গতকাল শনিবার ছুটির দিনেই কৃষি মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমে একটি ব্যাখ্যা পাঠায়। এতে ‘সার আমদানিতে নজিরবিহীন দুর্নীতির’ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। মন্ত্রণালয়ের দাবি, ‘সরকার যে প্রক্রিয়ায় কার্যাদেশ প্রদান করেছে, তাতে প্রতিটি কার্যাদেশের বিপরীতে টনপ্রতি ২০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে। আমদানি নিয়ে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ জুলাই সাড়ে ৯ লাখ টন সার আমদানির জন্য একটি টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এ টেন্ডারের মাধ্যমে ৫ লাখ ১৫ হাজার টন টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪ লাখ ৩৫ হাজার টন আমদানির জন্য পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ৫ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সার আমদানির কার্যাদেশ ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজন ব্যক্তির মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে মোট ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, যা মোট কার্যাদেশের ৪০ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

ওই ব্যক্তিকে দেওয়া কার্যাদেশেও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বড় কার্যাদেশ পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠান হলো দেশ ট্রেডিং করপোরেশন এবং বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। এই দুটি কোম্পানির স্বত্বাধিকারী আমিনুর রশিদ খান, যিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ে ‘মামুন’ নামে পরিচিত। এছাড়া, আরেকটি কোম্পানি এনআরকে হোল্ডিংস, যার স্বত্বাধিকারী নায়েব রশিদ খান। তিনি আমিনুর রশিদ খানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে পরিচিত।

জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া কার্যাদেশটিও আমিনুর রশিদ খান নিয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট দেশ থেকে সার আমদানির জন্য ভিন্ন ভিন্ন দর অনুমোদন করেছে। একই কার্যাদেশে দুটি দেশের জন্য ভিন্ন দর নির্ধারণ করা হলেও পরিমাণ একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। যে দেশে সারের দাম বেশি, সেখান থেকে কম পরিমাণ এবং যে দেশে দাম কম, সেখান থেকে বেশি পরিমাণ সার আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সুবিধা বাকি ১৮ আমদানিকারকের কাউকে দেওয়া হয়নি। অন্য আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী একটি লটের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট দামে একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশ ট্রেডিং করপোরেশনের নামে ৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই ৩০ হাজার টনের জন্য দুটি দেশের দর অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে মরক্কো থেকে প্রতিটন ৬৯৪ মার্কিন ডলার এবং লেবানন থেকে ৬৮৮ মার্কিন ডলারে কেনা হবে। তবে কোন দেশ থেকে কত পরিমাণ আমদানি করা হবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এ ধরনের কার্যাদেশ দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই বলে জানা গেছে। একইভাবে, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই সার দুটি দেশ থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মিসর থেকে ৮৭৪ মার্কিন ডলার এবং চীন থেকে ৮৪৮ মার্কিন ডলার দরে।

জানা গেছে, দেশ ট্রেডিং করপোরেশনকে ৩০ হাজার টন এবং বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে ৩০ হাজার টন করে মোট ৯০ হাজার টন টিএসপি সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে টিএসপি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। একইভাবে, ৩ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে ৪০ হাজার টন করে দুটি এবং এনআরকে গ্লোবালকে ৪০ হাজার টনের একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএপির ক্ষেত্রে আমিনুর রশিদ খানের প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন আমদানির অনুমতি পেয়েছে। ২৪ জুলাই এবং ৩ সেপ্টেম্বরের টেন্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

দেশের বিভিন্ন খাতে আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ও সার আমদানিতে সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বললেও, এক ব্যক্তিকে এত বেশি পরিমাণ সার আমদানির কার্যাদেশ দেওয়ায় নতুন সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। আমিনুর রশিদ খানের অনুকূলে দেওয়া ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির কার্যাদেশ নিয়ে তার আমদানি সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্দিষ্ট সময়ে সার আমদানি করতে না পারলে আসন্ন পিক সিজনে সারের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং সেলের একাধিক কর্মকর্তা আমিনুর রশিদ খানকে বড় পরিসরে কার্যাদেশ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন।

উল্লেখ্য, বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল শুধু নন-ইউরিয়া সার নয়, ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্যও বিসিআইসির তালিকাভুক্ত ঠিকাদার ছিল। ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরিবহন ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে সার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের তদন্তে সার আত্মসাতের অভিযোগে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নাম ছিল।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ভর্তুকির আওতায় বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে ২ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি, ৫ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি, ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি এবং ০.২০ লাখ মেট্রিক টন এমএপি সার সংগ্রহের জন্য প্রথম টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে ৪৯টি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাবে অংশ নেয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় সর্বনিম্ন দর গ্রহণ না করে দেশভিত্তিক একটি দর প্রস্তাব করে এবং আমদানিকারকদের মৌখিকভাবে এতে রাজি হতে অনুরোধ করে। এই অনুরোধে যারা রাজি হন, তারা মন্ত্রণালয়ে সম্মতিপত্র জমা দেন। তবে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ভুল দর উল্লেখ করে সম্মতিপত্র পাঠায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল, নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক দর উল্লেখ করে সম্মতিপত্র দেওয়ার। কিন্তু বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল টিএসপি আমদানির জন্য সব দেশের জন্য ৭০৪ মার্কিন ডলার দর উল্লেখ করে, যা শুধু তিউনিসিয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। মরক্কোর জন্য ৬৯৪ ডলার এবং লেবানন ও মিসরের জন্য ৬৮৮ ডলার দর নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবু এই প্রতিষ্ঠান মরক্কো ও লেবানন থেকে আমদানির কার্যাদেশ পেয়েছে।

এছাড়া, তারা নিয়ম অনুযায়ী ম্যানুফ্যাকচারার সার্টিফিকেট সংযুক্ত করেনি। মন্ত্রণালয় এই প্রতিষ্ঠানকে নতুন সম্মতিপত্র দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, যদিও অনেক আমদানিকারক সঠিক সম্মতিপত্র দিয়েও টিএসপি আমদানির কার্যাদেশ পাননি।

আমদানিকারকরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার বিশেষ বিবেচনায় এই অনিয়ম হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সার আমদানির জন্য দুটি দেশের দর উল্লেখ করে কার্যাদেশ দেওয়ার কোনো নজির নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংয়ের যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমার সঙ্গে মামুনের কোনো সম্পর্ক নেই। তার কয়টি কোম্পানি কাজ পেয়েছে, তাও আমি জানি না।’ তবে মন্ত্রণালয়ে আলোচনা রয়েছে যে, খোরশেদ আলমই আমিনুর রশিদ খানকে বড় কার্যাদেশ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সচিব ও উপদেষ্টাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে তিনটি প্রতিষ্ঠানই আলাদা। দেখা গেছে, আমিনুর রশিদ খানের কোম্পানিগুলোর সম্মতিপত্রের চিঠি সচিব বরাবর লেখা হলেও খোরশেদ আলমকে অ্যাটেনশন দেওয়া হয়েছে, যেখানে অন্য আমদানিকারকরা এই উইংয়ের প্রধান এবং অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমামকে মার্ক করে চিঠি দিয়েছেন।

জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, খোরশেদ আলম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এছাড়া, অতিরিক্ত সচিব ফয়সল ইমাম সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের একান্ত সচিব ছিলেন। সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘একই মালিক কি না, তা বিবেচ্য নয়; প্রতিষ্ঠান দেখে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। একজন মালিককে এত বেশি কাজ দেওয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে মন্ত্রণালয় পুরনো সিন্ডিকেটের প্রভাব কমাতে কাজ করছে। সার ব্যবস্থাপনা উইংয়ের কর্মকর্তারা এই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এখানে রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় চায় বেসরকারি খাতের আমদানি কমিয়ে বিএডিসির মাধ্যমে আমদানি বাড়াতে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত