দেশের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তার ‘ঘাপলা’র অভিযোগ অনেক দিনের। নিরাপত্তা পর্যাপ্ত নয় বলে চোরাচালানসহ নানা অপকর্ম ঘটে হামেশাই। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয় বটে, তবে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন একাধিক টিমে ভাগ হয়ে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা দিচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষেরও আলাদা নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে। পুলিশের বিশেষ ইউনিট এয়ারপোর্ট আর্মড ব্যাটালিয়নকে সংযুক্ত করা হয়েছে, অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয়েছে তাদের। বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বেবিচকের নিরাপত্তা গ্রুপকে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় এত কিছু সক্রিয় থাকার পরও নতুন করে ‘এয়ার গার্ড অব বাংলাদেশ’ (এজিবি) নামে বিশেষ বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গত ৩১ আগস্ট গঠন করা হয়েছে বিশেষ কমিটি, এতে বেবিচকের কোনো সদস্যকে রাখা হয়নি। কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত না করা এবং নতুন বাহিনী গঠনের উদ্যোগে ফুঁসছে বেবিচক। বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংস্থাটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা বলেছেন, একটি প্রভাবশালী মহল একটি বাহিনীকে সামনে এনে কাজ করতে চাচ্ছে।
এদিকে, বেবিচক আমর্ড ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শককে বিমানবন্দর থেকে প্রত্যাহার করতে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি পাঠানোকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ঘটনার ১৬ দিন পর চিঠির বিষয়ে ‘বিস্ময়’ প্রকাশ করেছেন পুলিশ কর্তারা। এখন পুলিশও পাল্টা চিঠি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সবকটি বিমানবন্দরে সার্বক্ষণিক কঠোর নিরাপত্তাবলয় থাকুক আমরা সবসময় চেয়েছি। আমি যখন বেবিচকের চেয়ারম্যান ছিলাম তখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি নিরাপত্তার বিষয়টি অক্ষুন্ন রাখতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অবশ্যই ভালো। তবে বেবিচকের পরামর্শ নিলে ভালো হবে কমিটির। বেবিচকের প্রতিনিধি কমিটিতে রাখা উচিত ছিল। এর আগেও এ রকম একটি বাহিনী করার পরিকল্পনা ছিল। বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এজিবি বাহিনীর কাজ কী হবে তা আগে জানালে ভালো হয়। আইকাওর রুলস অনুসরণ করতে হবে সবাইকে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে নতুন বাহিনী গঠন করলে ভালো হবে।’
বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ুক আমরাও চাই। তবে এমন কিছু করা ঠিক হবে না যাতে আমরা ভুক্তভোগী হই। আইকাওতে স্পষ্ট বলা আছে, বেবিচককে সঙ্গে নিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করতে হবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটিতে বেবিচকের কাউকে রাখেনি। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফোর্স নামে একটি বাহিনী গঠন করার চেষ্টা হয়েছিল। তারাও আমাদের বাদ দিয়ে সবকিছু করতে চেয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত পারেনি। এবারও আমাদের বাদ দিয়ে সফলতা পাওয়া যাবে না। প্রয়োজনে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলব।’
অসন্তোষের ভয়ে আগেও পিছু হটেছে : সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের সব বিমানবন্দরেই বিশাল নিরাপত্তা বাহিনী আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিমান ও যাত্রী-দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। বিমানবন্দরে অপরাধ ঠেকাতে একগুচ্ছ ব্যবস্থাও নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তারপরও বিমানবন্দরে নানা অপরাধ সংঘটনের বদনাম রয়েছে। বদনাম ঘুচাতে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। মাস ছয়েক আগে ‘বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফোর্স’ নামে একটি আলাদা সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। ১০ হাজার ৬৩২ সদস্যের ৭০ ভাগ বিমান বাহিনী থেকে; বাকি ৩০ ভাগ বেসামরিক লোকবল থেকে নেওয়ার কথা ছিল। ফোর্স গঠনের খরচ ধরা হয়েছিল ৩৯৭ কোটি ২ লাখ টাকা। এরপরই এ বাহিনী গঠন করা নিয়ে বেবিচকে অসন্তোষ দেখা দেয়। অসন্তোষের তীব্রতায় বাহিনী গঠন করা আর হয়নি।
আবারও নতুন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ : সূত্র জানায়, বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তায় একটি বিশেষ বাহিনী করতে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অনুরোধ করে বিমান বাহিনী। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্দেশে কমিটি গঠন করা হয়। তবে বাহিনীর প্রধান কোনো বাহিনী থেকে আসবে, বাহিনীর সদস্য সংখ্যা কত হবে, কাজের পরিধি কী হবে, কোন কোন বাহিনীর সদস্য বিশেষ এ বাহিনীতে যুক্ত হবেন সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এরপর হঠাৎ করেই এয়ার গার্ড বাংলাদেশ নামে একটি বিশেষ বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা অফিস আদেশ জারি করে। ওই আদেশে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মুহাম্মদ আবদুল্যাহ আল জাবেদ। ১২ সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ও অর্থ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আতাউর রহমান খানকে। কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে দেশি-বিদেশি অন্তত ৩৭টি বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৪০ হাজারের মতো যাত্রী আসা-যাওয়া করছে শাহজালাল, শাহআমানত, ওসমানী প্রভৃতি বিমানবন্দরে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরালো না থাকায় যাত্রীবেশী অপরাধীরা সহজেই অপরাধ কর্মকা- চালাতে পারছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। যাত্রী হয়রানির ঘটনা তো আছেই। লাগেজ নিয়েও ভোগান্তির অন্ত নেই। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা যানবাহনের অভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা রেন্ট-এ কারের লোকজন তাদের জিম্মি করে বলে অভিযোগ আছে।
যেসব সংস্থা দায়িত্ব পালন করছে বিমানবন্দরে : হযরত শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে এভসেক, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও বেবিচকের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী নিরাপত্তায় দায়িত্বে নিয়োজিত। আনসার বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্বে আছেন। এসব বাহিনীর মধ্যে দায়িত্ব পালন করা নিয়ে প্রায়ই বিরোধ তৈরি হচ্ছে। বিরোধকে পুঁজি করে সামনে এসেছে একটি প্রভাবশালী মহল। বেবিচকের একজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রায়ই বিরোধের ঘটনা ঘটছে এটা সত্য। এ সুযোগে একটি প্রভাবশালী মহল আরেকটি বিশেষ বাহিনী গঠন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এজিবি নামের বিশেষ বাহিনী গঠিত হলে বেবিচকের সঙ্গে আরও দূরত্ব বাড়বে। নতুন বাহিনী গঠন হলে নির্দিষ্ট অর্গানোগ্রামও থাকবে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, সংস্থাটির আগের চেয়ারম্যান আরেকটি বাহিনী গঠন করার উদ্যোগ নিলে গত ১৭ মার্চ বেবিচক সদর দপ্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সভা হয়। ওই পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বাহিনী গঠনের উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়ানো হয়। এমন অবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেওয়ায় আবারও আন্দোলন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
বেবিচকের চিঠিতে ক্ষুব্ধ পুলিশ : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিয়ে একটি বৈঠকে এপিবিএনের একজন অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শকের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তুলকালাম কা- ঘটেছে। ওই কর্মকর্তাকে বিমানবন্দর থেকে প্রত্যাহার করতে বেবিচক পুলিশ সদর দপ্তরে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠি দেওয়ায় পুলিশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ওই বৈঠকের ১৬ দিন পর অর্থাৎ ৯ সেপ্টেম্বর বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) মো. আসিফ ইকবাল পুলিশ প্রধানের (আইজি) কাছে চিঠি পাঠিয়ে এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি সিহাব কায়সার খানের বক্তব্য শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে দাবি করেন। চিঠি পেয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বেবিচক কর্মকর্তার চিঠি নিয়ে আলোচনা হয়। এ ধরনের চিঠি দিতে পারেন কি না, তা নিয়ে বৈঠকে প্রশ্ন তোলা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইজিপিকে তিনি এভাবে লিখতেই পারেন না। তার কর্মপরিধিতে এমন এখতিয়ারও নেই। বৈঠকে বিমান উপদেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের সচিব উপস্থিত ছিলেন। শিষ্টাচার লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠাতে পারত। কারও উস্কানিতে বেবিচক এই কাজটি করেছে। এপিবিএনের অধিনায়ক সিহাব কায়সার খান মিথ্যা বা বানোয়াট কিছুই বলেননি। যা সত্য তিনি উপদেষ্টার কাছে তা তুলে ধরেছেন। এখানে শিষ্টাচার লঙ্ঘনের কোনো কিছুই ছিল না। একটি বাহিনীকে আরেকটি বাহিনীর মুখোমুখি করার পাঁয়তারা করছে বলে আমরা মনে করছি। তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দর থেকে এপিবিএকে হটাতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমরাও মন্ত্রণালয়কে পাল্টা চিঠি দিয়ে যারা এসব করছেন তার ফিরিস্তি তুলে ধরব। বিষয়টি অন্যদিকে চলে যাচ্ছে বলে আমরা মনে করছি। এপিবিএন দেশের সবকটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা দিয়ে আসছে। একটি মহল চায়, একটি বাহিনীকে পুরো বিমানবন্দরের দায়িত্ব দিতে। আর এটি করা হলে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।
চিঠিতে যা বলা হয়েছে : গত ২৪ আগস্ট উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সভাপতিত্বে বিমানবন্দরের কনফারেন্স রুম-১ এ একটি সভা হয়। সভায় সচিব নাসরিন জাহান, বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় এয়ারপোর্ট এপিবিএনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিহাব কায়সার খান বলেন, ‘হঠাৎ করে যখন বাংলাদেশে কর্মবিরতির একটি ব্যাপার ছিল পুলিশের, তখন ওই জায়গাটায় ভ্যাকিউমের সময় কিউআরএফ ফ্রম এয়ার ফোর্স ডিপ্লয়মেন্ট হয়। আপনারা (বাংলাদেশ বিমানবাহিনী) যদি “ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার” এ আসেন.. তাহলে বর্তমানে সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছে জেলায়, মেট্রোতে... তারা সবাই কিন্তু এইড করছে, কাকে? সিভিল পাওয়ারকে। মানে পুলিশকে এইড করছে। আপনারা (বিমানবাহিনী) তো আমাকে (এপিবিএন) এইড করছেন না, আপনারা তো আমাকে রিপ্লেস করে ফেললেন, আমি তো আমার জায়গাতে নেই।
