জুলাই-আগস্টে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের
নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি জবানবন্দি দেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ের আগেই আওয়ামী লীগ পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র করেছিল। মাহমুদুর রহমান এ মামলার ৪৬তম সাক্ষী। আজ মঙ্গলবার তিনি জবানবন্দির শেষাংশ সম্পন্ন করবেন। এরপর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন তাকে জেরা করবেন।
জবানবন্দিতে মাহমুদুর রহমান আওয়ামী লীগ শাসনামলে ‘ফ্যাসিবাদের’ উত্থান, বিকাশ ও পতন নিয়ে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সৃষ্টি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই পরিকল্পনায় বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে একটি বিদেশি শক্তি জড়িত ছিল।’ তিনি বলেন, ‘ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনীমূলক বই ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ট্রাইব্যুনালকে জানাতে চাই, ২০০৮ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সঙ্গে দিল্লিতে তার কথোপকথন হয়েছিল। তখন তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। মইনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে জয়ী করে প্রধানমন্ত্রী করলে মইন চাকরির নিশ্চয়তা, আর্থিক সুবিধা ও নিরাপদ প্রস্থান পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ১০ মাস আগেই দিল্লিতে ফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। এতে মইন উ আহমেদ ও ডিজিএফআইয়ের সরাসরি ভূমিকা ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা বুঝেছিলেন, বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা প্রয়োজন। কারণ, সেনাবাহিনীর মনোবল উঁচু থাকলে তারা বিদেশি শক্তির ইঙ্গিতে পুতুল সরকার মেনে নেবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মধ্যে বিডিআর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।’
মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘এই পরিকল্পনায় শেখ পরিবারের সদস্য ও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ শেখ তাপস সরাসরি জড়িত ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে থেকে বিডিআরের কিছু সদস্যের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে শেখ তাপস ও আওয়ামী লীগ নেতারা এই হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি তৈরি করেন।’
জবানবন্দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সাবেক চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপ কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ উঠে আসে। তিনি বলেন, ‘স্কাইপ কথোপকথনে দেখা যায়, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া তামাশায় পরিণত হয়েছিল। সাক্ষীর জেরা, প্রশ্নোত্তর থেকে খসড়া রায় পর্যন্ত বিচারপতি নিজামুল হক, বেলজিয়ামে অবস্থানরত জিয়াউদ্দিন ও প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম আগেই নির্ধারণ করতেন।’ তিনি বলেন, ‘স্কাইপ ও ইমেইলের তথ্য থেকে স্পষ্ট, এই মামলার রায় পূর্বনির্ধারিত ছিল।’
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সালের মধ্যে শেখ হাসিনা সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক দমননীতি শুরু হয়।
