জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা পুনর্বহাল করেছিল। তিনি জানান, গত বছর ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে সম্বোধন করেন। তার ওই বক্তব্যে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা অপমানিত বোধ করে এবং সেটি আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের আক্রমণকে বৈধতা দেয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল বুধবার শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন নাহিদ ইসলাম। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই বিচারকের ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এ মামলায় তিনি ৪৭তম সাক্ষী।
গতকাল বেলা ২টা ৫৪ মিনিটে নাহিদ জবানবন্দি শুরু করেন, যা বিকেল ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত চলে। সোয়া এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, ধারাবাহিক আন্দোলন এবং গত বছর ১৯ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। তার অসমাপ্ত জবানবন্দি শেষে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি করা হয়।
সাবেক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০১৮ সালে তিনি প্রথম কোটা আন্দোলনে যুক্ত হন। কোটা সংস্কারের দাবিতে একটি বড় ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ওই বছর ৮ এপ্রিল আন্দোলন দমনে পুলিশ ও ছাত্রলীগ শাহবাগে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে এবং রাতে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে হামলা করে। ওই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।
নাহিদ বলেন, ‘আমরা কোটার সংস্কার চেয়েছিলাম, কিন্তু সরকার পুরোপুরি কোটা বাতিল করে। আমরা এটিকে আপাতত মীমাংসা হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।’ তবে তিনি জানান, ওই ঘোষণার পরও পুলিশ আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার শুরু করে এবং ছাত্রলীগ হামলা চালায়। পরে সরকার কোটা বাতিলের গেজেট প্রকাশ করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকারের আচরণ থেকে তারা বুঝতে পারেন যে, আন্দোলন দমনের জন্যই কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে সরকার কোটা বাতিল চায়নি। কিছুদিন পর শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি রাগের মাথায় কোটা বাতিলের কথা বলেছিলেন।’
নাহিদ বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করেছিলাম যে, কোটাপ্রথা আবার ফিরে আসবে। ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে আমি কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্যানেল থেকে কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। নির্বাচনে অনিয়মের মাধ্যমে ছাত্রলীগকে বেশিরভাগ পদে জয়ী করা হয়। পরে আমরা ছাত্রলীগের গেস্টরুম, গণরুম, নির্যাতনের সংস্কৃতি এবং অন্যান্য অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি।’
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ জুন একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে কোটাপ্রথা পুনর্বহাল করে। ওইদিন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করি। পরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ হয়। আমরা সরকারকে ৩০ জুনের মধ্যে কোটা সংস্কারের সমস্যা সমাধানের আলটিমেটাম দিই। সরকার সাড়া না দেওয়ায় ১ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহাল ও যৌক্তিক কোটা সংস্কারের দাবিতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু করি, যা অব্যাহত থাকে।’
জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে : জুলাই-আগস্টে ব্যাপক হত্যাকা-ে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ, মিলিটারিসহ অন্য বাহিনীর যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকা- ও গুমের ঘটনায় যুক্ত, তাদের যাতে বিচারের আওতায় আনা হয়। কোনো বাহিনী থেকে যাতে কেউ পার পেয়ে না যায়, সেটা আমাদের কাছে স্পষ্ট থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, গুমের ঘটনায় অনেক অভিযোগ এসেছে। আমি নিজে অভিযোগ দিয়েছি, ডিজিএফআইয়ের যেসব কর্মকর্তা আমাকে তুলে নিয়ে গেছে, আমাকে হেনস্তা করা হয়েছে, এ ছাড়া সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অফিসার র্যাবে যারা ছিল, ডিজিএফআইতে যারা ছিল তাদের যে নেতিবাচক ভূমিকা গুমের ঘটনায় এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পালন করেছে, আপনারা রামপুরা-বাড্ডার ঘটনায় দেখেছেন, বিজিবির একজন আর্মি অফিসার, এদেরকে কিন্তু এখনো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। ট্রাইব্যুনালের কাছে, সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, যে অপরাধী, তাকে যেন বিচারের আওতায় আনা হয়। সে কোন বাহিনীর, সেটা যাতে দেখা না হয়।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি ন্যায়বিচারের। এত মানুষ, আমাদের ভাই-বোনেরা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন। আমরা সকলেই ন্যায়বিচার পাব। যারা এই হত্যাকা-ে জড়িত ছিল আওয়ামী লীগ, পুলিশসহ যারা জড়িত, তারা বিচারের আওতায় আসবে, তাদের শাস্তি হবে। এটা সারা পৃথিবীর জন্য ন্যায়বিচারের একটা নিদর্শন হয়ে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে আমরা সন্তুষ্টি জ্ঞাপন করছি। এটা কিন্তু একটা মামলা। ট্রাইব্যুনালে অনেক মামলা রয়েছে। সাধারণ আদালতেও অনেক মামলা রয়েছে। গুমের মামলা রয়েছে। ফলে এই বিচারকে সার্বিকভাবে দেখতে হবে।’
মাহমুদুর রহমানের সাক্ষ্য শেষ : জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মাহমুদুর রহমানকে জেরা করেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। এর আগে গত সোমবার ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন মাহমুদুর রহমান। পরে মঙ্গলবার অবশিষ্ট জবানবন্দি দেন তিনি।
