৪ আগস্ট ড. ইউনূসকে সরকারপ্রধানের প্রস্তাব

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:৫৯ এএম

গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেই সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয় এবং এর অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে (এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা) সরকারপ্রধান হতে প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শীর্ষ এ সমন্বয়ক আরও বলেছেন, সমন্বয়কদের ডিবিতে নিয়ে আটক ও নির্যাতনের নির্দেশ দিয়েছিলেন ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানান তিনি। জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাকা-, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বুধবার ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন নাহিদ ইসলাম। জবানবন্দিতে তিনি শেখ হাসিনাসহ আরও যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী, তাদের কঠোর শাস্তির আরজি জানান ট্রাইব্যুনালের কাছে।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত দুই বিচারকের ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। আগামী রবিবার পর্যন্ত জেরা মুলতবি করেন আদালত। নাহিদ ইসলাম এ মামলার ৪৭তম সাক্ষী। গত বুধবার তিনি গত বছর ১৯ জুলাই পর্যন্ত ঘটে যাওয়া হত্যাকা- ও বিভিন্ন ঘটনা জবানবন্দিতে তুলে ধরেন।

গতকাল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ বলেন, মিডিয়ার মাধ্যমে কোনো সংবাদ না পাওয়ায় আন্দোলনের অন্যান্য সমন্বয়কের সঙ্গে মোবাইল ফোনে ১৮ ও ১৯ জুলাই দেশব্যাপী যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চলেছে, সে সম্পর্কে জানতে পারেন। ১৯ জুলাই বিকেলে তাদের পরামর্শে সমন্বয়ক আবদুল কাদের ৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।

জবানবন্দিতে নাহিদ ইসলাম এ সময় নন্দীপাড়ায় এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় এবং সেখান থেকে তাকে ডিবির তুলে নেওয়া ও নির্যাতনের বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ২৩ জুলাই ডিজিএফআই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এবং আমাকে জোরপূর্বক হাসপাতাল থেকে সেখানে নিয়ে যায়। প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলন সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়ার চাপ থাকলেও আমি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিই। ডিজিএফআই আমাকে বলতে বলে যে, বিএনপি-জামায়াত এ আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে নাশকতা করছে। কিন্তু আমি তা বলিনি।

তিনি বলেন, ২৬ জুলাই দুপুরের দিকে ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি আসিফ, বাকের ও আমাকে মাইক্রোবাসে করে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। সেখানে ডিবিপ্রধান হারুন আন্দোলন স্থগিত করতে বলেন। অন্যথায় আমাদের বিরুদ্ধে এ আন্দোলনের কারণে মামলা হবে বলে হুমকি দেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা প্রথমে রাজি হইনি। পরদিন সমন্বয়ক হাসনাত ও সারজিসকে ডিবি অফিসে নিয়ে আসা হয়। পরে সমন্বয়ক নুসরাতকেও নিয়ে আসা হয়। সেখানে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। আমাদের অভিভাবকদেরও সেখানে আনা হয়। আন্দোলন বন্ধ করার জন্য চাপ ও মামলার হুমকি দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, তারা (ডিবি) আমাদের জানায়, প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর (আসাদুজ্জামান খান কামাল) নির্দেশনায় আমাদের তুলে আনা, আটক রাখা ও নির্যাতন করা হয়েছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি সফল করার উদ্দেশে সমন্বয়কদের পক্ষে মাহফুজ আলম (এখন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা) অন্যান্য ছাত্র সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে লিয়াজোঁ করছিলেন। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে আমরা নতুন সরকার গঠনের জন্য ড. ইউনূস স্যারের সঙ্গে আলোচনা করি। তাকে নতুন সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দিই।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট সারা দেশের মানুষ ঢাকায় আসতে থাকে। আমরা শাহবাগে অবস্থান গ্রহণের চেষ্টা করি। শহীদ মিনার ও চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে আমরা গণভবনের উদ্দেশে রওনা দিই। পথে সংবাদ পাই গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে গেছেন। নাহিদ বলেন, ৫ আগস্ট ঢাকাসহ সারা দেশে সরকার কর্তৃক ব্যাপক হত্যাকা- ও নির্যাতনের সংবাদ পাই। সেদিন আমাদের বহুসংখ্যক আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা শহীদ ও আহত হন।

নাহিদ ইসলাম জুলাই-আগস্টে ব্যাপক হত্যাকা- ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, এসব ঘটনার জন্য শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের এবং যারা হত্যাকা- ও নির্যাতনে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের দায়ী করছি। তারা ক্ষমতা পাকাপোক্ত ও নিরঙ্কুশ করতে এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে। আমি এই হত্যাযজ্ঞ, নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই এবং কঠোর শাস্তি দাবি করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত