আল্লাহ সবসময় ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। এই ‘সঙ্গে থাকা’ বিশেষ ধরনের সাহচর্যকে বোঝায়। মহান আল্লাহ আরশের ওপর থেকে ধৈর্যশীল বান্দাকে সাহায্য-সহযোগিতা করার মাধ্যমে তার সঙ্গে রয়েছেন বলে বুঝে নিতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আছেন।’ (সুরা আনফাল ৪৬) মহান আল্লাহর এই সার্বক্ষণিক সঙ্গ ও সান্নিধ্যের সুবাদে ধৈর্যশীলরা ইহকাল ও পরকালের প্রভূত কল্যাণ অর্জন করে এবং তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতরাজি লাভে ধন্য হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
কষ্টের পর সুখ : পৃথিবীতে যারা সুন্দর জীবন গড়েছে, তারা ধৈর্যের মাধ্যমেই তা করতে পেরেছে। অনেকে ধৈর্যের মাধ্যমে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরেও আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ ধরনের ব্যক্তি যেমন দুঃসময়ে ধৈর্যধারণ করে, তেমনি সুসময় এলে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। ধৈর্যধারণ করলে সুখ ও প্রশান্তি আসবেই। যেমনিভাবে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘আল্লাহ শিগগিরই কষ্টের পর স্বস্তি দেবেন।’ (সুরা তালাক ৭) এ আয়াতেও এটি স্পষ্ট যে, কষ্টের পর সুখ ও স্বস্তি আসবেই। কিন্তু কষ্টের সেই সময়টুকুতে ধৈর্য ধরতে পারলেই সুখ অর্জন করা সম্ভব হবে।
আল্লাহর সাহায্য লাভ : ধৈর্য আল্লাহর বিশেষ গুণ। পবিত্র কোরআনে একাধিক স্থানে মহান আল্লাহ নিজেকে ধৈর্যশীল ও পরম সহিষ্ণু হিসেবে পরিচয় প্রদান করেছেন। সহিষ্ণুতা সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহই তো সম্যক প্রজ্ঞাময় ও পরম সহনশীল।’ (সুরা হজ ৫৯) সেজন্য যারা ধৈর্যধারণ করে তারাই আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্ত হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩) সুতরাং যে তার ওপর নিপতিত কষ্টে ধৈর্যধারণ করবে না, তার জন্য প্রিয়তম প্রভুর থেকে সাহায্যও আসবে না।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তুমি যা অপছন্দ করো তাতে ধৈর্যধারণের বেলায় তোমার জন্য কল্যাণ নিহিত আছে। আর জেনে রেখো, রবের সাহায্য কেবল ধৈর্যধারণকারীদের সঙ্গেই।’ (মুসনাদে আহমাদ)
আল্লাহর প্রশংসা অর্জন : প্রকৃত মুমিন ধৈর্যশীল হয়। কোনো বিপদ ও কষ্টই তাকে বিচলিত করতে পারে না। যারা সংকট ও বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে নামাজ আদায় করে, জাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা অভাব-অনটনে, দুঃখ-কষ্টে এবং যুদ্ধের সময়ে ধৈর্যধারণ করে, বস্তুত তারাই হলো সত্যবাদী এবং তারাই আল্লাহভীরু।’ (সুরা বাকারা ১৭৭)
মহান আল্লাহ হজরত আইয়ুব (আ.)-এর উত্তম প্রশংসা করেছেন। কেননা তিনি কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করেছিলেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আমি তাকে পেয়েছি পূর্ণ ধৈর্যশীল, কতই না উত্তম বান্দা সে। নিশ্চয়ই সে ছিল আমার অভিমুখী।’ (সুরা সোয়াদ ৪৪) মহান আল্লাহ হজরত আইয়ুব (আ.)-এর দৃঢ়তা ও ধৈর্যশীলতার কারণে তাকে উত্তম বান্দা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় এতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক চরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।’ (সুরা ইব্রাহিম ৫)
উত্তম প্রতিদান লাভ : ধৈর্যশীলতা অর্জন করা যত কঠিন, এর পুরস্কারও তত বড়। মুমিন যখন নিজের ওপর আপতিত বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহকে ডাকে এবং তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তখন মহান আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হন। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে অপরিমিত প্রতিদান প্রদান করার ঘোষণা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধৈর্যশীলদের অপরিমিত প্রতিদান দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার ১০) প্রতিটি আমলের সওয়াব কী পরিমাণ হবে সেটি জানা যায়। তবে ধৈর্যের বিনিময়ে কী পরিমাণ সওয়াব মিলবে সেটি জানা যায় না। মুষলধারায় বর্ষিত পানি যেমন, ধৈর্যের সওয়াবও তেমনি অপরিমিত। (আসসবরু ওয়াস সাওয়াবু আলাইহা ২৯)
ক্ষমা লাভ : কেউ নেককার ও ধৈর্যশীল হলে তার জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সওয়াব রয়েছে। ধৈর্যশীলরা কখনোই অপদস্ত ও লাঞ্ছিত হবে না। তারা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। অপরদিকে যে ব্যক্তি ইমান আনে না, হকপন্থিদের সঙ্গে থাকে না এবং ধৈর্য ধরে না, সে ব্যাপক ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন ‘কসম যুগের! মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে আছে। কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান এনে সৎকর্ম করে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা আছর ১-৩)
যারা কষ্টে ধৈর্যধারণ করে, অধৈর্য হয় না, কষ্টের সাগরে হাবুডুবু খেয়েও আল্লাহকে ভুলে যায় না, বরং সবসময় নেক আমল করে, তাদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশাল উপহার রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং সৎকর্ম করেছে তাদের জন্যই ক্ষমা ও মহাপুরস্কার রয়েছে।’ (সুরা হুদ ১১)
উল্লেখ্য, যারা বিপদে পড়লে অধৈর্য হয়ে পড়ে এবং হতাশ হয়ে কুফরি করে অথবা নেয়ামত ও সুখময় জীবন পেলে অহংকার, আত্মতুষ্টি ও আত্মম্ভরিতায় ভোগে তারা এই ক্ষমা ও প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত নয়।
ধৈর্য এমন এক মহৎ গুণ, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণের জন্য অপরিহার্য। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, শৃঙ্খলা ও কল্যাণকর জীবনযাপনের জন্য ধৈর্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সুতরাং আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করব, তাহলেই আমাদের জীবন হবে সুন্দর ও সার্থক।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
