মক্কায় আবরাহার আক্রমণ ও বিপর্যয়

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৩৪ এএম

কিছু কিছু ঘটনা যুগে যুগে মানুষের জন্য শিক্ষা ও উপদেশের উৎস হয়ে আছে। এমনই এক ঘটনা হলো মক্কায় এসে আবরাহার কাবা আক্রমণ। এ ঘটনা সমগ্র বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে আছে। কারণ এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল আল্লাহর শক্তি, মহিমা ও তার ঘর কাবা শরিফের প্রতি বিশেষ সুরক্ষার এক জ্বলন্ত নিদর্শন। পবিত্র কোরআনের সুরা ফিলে এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা এ ঘটনার মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, তার ঘর ও তার নিদর্শনের ক্ষতি করার ক্ষমতা কারও নেই, দুনিয়ার যতই শক্তি থাকুক না কেন, আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটতে পারে না।

আবরাহা ছিলেন ইয়েমেনের গভর্নর। আরববাসীরা কাবা শরিফে হজ পালনের জন্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগমন করত। এ দৃশ্য দেখে আবরাহা অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত হন। তিনি ভেবেছিলেন, যদি ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করেন এবং মানুষকে সেখানে হজ পালনে আহ্বান জানান, তাহলে আরববাসীদের কাবার প্রতি আকর্ষণ কমে যাবে। তাই তিনি এক বিশাল গির্জা নির্মাণ করেন। কিন্তু আরবদের হৃদয়ে কাবার প্রতি যে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল, তা অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা সম্ভব হয়নি। বরং তারা এ ঘটনাকে অপমানজনক মনে করে। এক রাতে বনু কিনানা গোত্রের কয়েকজন লোক গির্জায় গোপনে প্রবেশ করে সেটিকে নোংরা করে দেয়।

এ ঘটনায় আবরাহা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিশোধের লক্ষ্য ছিল কাবা ধ্বংস করা। তিনি ষাট হাজার অস্ত্রসজ্জিত সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশে অগ্রসর হন। তার সঙ্গে ছিল ৯টি অথবা ১৩টি বিশাল হাতি, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিতে তিনি নিজেই আরোহণ করেছিলেন। বাহিনী এগোতে এগোতে মক্কার নিকটবর্তী মুগাম্মাস নামক স্থানে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা প্রস্তুতি নিয়ে কাবা ধ্বংসের জন্য অগ্রসর হয়।

যখন তারা মুজদালিফা ও মিনার মধ্যবর্তী স্থান ওয়াদি মুহাসসারে পৌঁছায়, তখন আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। আবরাহার হাতিটি মাটিতে বসে পড়ে। যতই চেষ্টা করা হয়, কাবার দিকে এক পা-ও বাড়ায়নি। অথচ হাতিটিকে উত্তর, দক্ষিণ বা পূর্ব দিকে ঘোরানো হলে সহজেই উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে যেত। এতে বোঝা গেল, আল্লাহর ঘরের দিকে সে অগ্রসর হওয়ার ক্ষমতা পাচ্ছে না।

এমন সময় আল্লাহতায়ালা আসমান থেকে তার সৈন্য প্রেরণ করলেন। ছোট ছোট আবাবিল পাখির ঝাঁক আকাশ থেকে নেমে এলো। প্রত্যেক পাখির ঠোঁটে একটি করে ছোট পাথর আর দুই পায়ে দুটি করে পাথর ছিল। এই ক্ষুদ্র পাথরগুলো ছিল ছোলার দানার মতো। কিন্তু এগুলো নিক্ষিপ্ত হয়ে যাদের গায়ে লাগত, তাদের অঙ্গ ফেটে যেত, রক্ত বের হতে হতে মৃত্যু ঘটত। সৈন্যদল আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করে। পদদলিত হয়ে অনেকেই প্রাণ হারায়। মুহূর্তেই বিশাল বাহিনী ভেঙে পড়ে।

আবরাহার নিজেরও ভয়াবহ পরিণতি হয়। আল্লাহ তার শরীরে কঠিন রোগ দেন। তার আঙুলগুলো খুলে যায়, শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সানা শহরে পৌঁছার আগেই তিনি মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তার বুক ফেটে হৃদপিণ্ড বের হয়ে এসেছিল।

এ দৃশ্য দেখে মক্কাবাসীরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। আবরাহার বাহিনীর ভয়াবহ শক্তি দেখে তারা পাহাড় ও পর্বতে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু যখন তারা প্রত্যক্ষ করল, এ বিশাল বাহিনী মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন তারা স্বস্তি নিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরে আসে। কাবা শরিফ অক্ষত থেকে যায়, কারণ এর রক্ষক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ। আর এ ঘটনা ঘটেছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের মাত্র কিছুদিন আগে। (ইবনে হিশাম ১/৪৫৬)

লেখক : ইমাম ও খতিব, চাঁদপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত