ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে আসতে দেরি, বাড়ছে মৃত্যু

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৬ এএম

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণেই চিকিৎসার সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং বেড়ে যাচ্ছে মৃত্যুর ঝুঁকি। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছে। গতকাল সোমবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সব তথ্য তুলে ধরেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর।

তিনি বলেন, চলতি বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১৭৯ জন। এদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি রোগী ভর্তি হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই মারা গেছে। মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে যারা মারা গেছে তাদের অনেকেই খারাপ অবস্থায় হাসপাতালে এসেছে। অনেক সময় দেরিতে ভর্তি হচ্ছে, ফলে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ খুব সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

ডা. জাফর সতর্ক করে বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের গত কয়েক দিনে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা বেড়েছে। বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছরই এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। গত বছরের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের জুনে মারা যায় আটজন, জুলাইয়ে ১৪ জন, আগস্টে ৩০ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৮৭ জন। সে বছর জুনে রোগী ভর্তি হয়েছিল ৭৯৮ জন, জুলাইয়ে ২ হাজার ৬৬৯, আগস্টে ৬ হাজার ৫২১ এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৮৯৭ জন। তিনি বলেন, পরিসংখ্যান স্পষ্ট করছে, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং মৃত্যুও ঘটে সবচেয়ে বেশি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু ব্যবস্থাপনা জানানো নয়, জনগণকে সম্পৃক্ত করাও। কারণ, যত উদ্যোগই নেওয়া হোক, মানুষ সচেতন না হলে ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়।

সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ডা. জাফর বলেন, ডেঙ্গু যদি শুরুতেই শনাক্ত করা না যায় এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হয়, তাহলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আপনাদের সহযোগিতা আমাদের দরকার, যাতে সচেতনতা আরও ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য এনএস১ কীট সব জায়গায় মজুদ আছে এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন।

মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ নিয়ে বিভ্রান্তির প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক ডা. জাফর বলেন, প্রকাশিত খবরে এসেছে, ২৪ ঘণ্টায় ১২ জন মারা গেছে। প্রকৃতপক্ষে এর ৯ জন মারা যায় বৃহস্পতিবার। কিন্তু শুক্রবার সরকারি ছুটি থাকায় সঠিক সংখ্যা প্রকাশ পায়নি। এতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এটিকে আমাদের ব্যর্থতা হিসেবেই মনে করি।

২৪ ঘণ্টায় দুজনের মৃত্যু : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে জানানো হয়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা দুজন বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত মশাবাহিত রোগটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮১ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৬৭৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১২৬ জন, ঢাকা বিভাগে ১১৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ৫৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৩ জন, খুলনা বিভাগে ২৫ জন, বরিশাল বিভাগে ১৪৯ জন, রংপুর বিভাগে ১০ জন এবং সিলেট বিভাগে তিনজন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে সোমবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ১৮১ জন মারা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু (৮৫ জন) হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। পাশাপাশি এই সময়ে বরিশাল বিভাগে ২৮ জন ছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২২ জন, রাজশাহী বিভাগে ১০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ছয়জন, খুলনা বিভাগে পাঁচজন এবং ঢাকা বিভাগে দুজন ডেঙ্গুতে মারা গেছে।

এর আগে, গত রবিবার মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশে আরও ১২ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যা চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছিল।

উল্লেখ্য, দেশে এক বছরে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১১ জন, ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন, ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন, ২০২০ সালে ১৪০৫ জন এবং ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত