কলম্বোর দৃষ্টিনন্দন লাল মসজিদ

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০৬ এএম

ভারত মহাসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এক ব্যস্ততম বন্দরনগরী শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো। প্রাচীনকাল থেকেই এটি বাণিজ্যের জন্য পরিচিত। নানা জাতি, নানা সংস্কৃতির মানুষের পদচারণায় শহরটি আজও বহুজাতি ও বহুধর্মীয় সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত। এই নগরীর কোলাহলমুখর পেট্টাহ বাজারের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্য লাল মসজিদ। স্থানীয়ভাবে পরিচিত জামিউল আলফার মসজিদ, তবে লাল-সাদা ডোরা কাটা দেয়াল আর গম্বুজের অনন্য নকশার কারণে বিশ্ব জুড়ে এটি পরিচিত ‘রেড মসজিদ’ নামে।

মসজিদটির ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো। ১৯০৮-০৯ সালে স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ীরা এটি নির্মাণ করেন। সে সময় দক্ষিণ ভারত থেকে আগত মুসলিম বণিকরা শ্রীলঙ্কায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। নামাজ ও ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য তাদের একটি বৃহৎ মসজিদের প্রয়োজন অনুভূত হয়, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় এই স্থাপত্যকীর্তির। শুরুতে মসজিদটি ছিল ছোট আকারের, তবে ক্রমে এর গুরুত্ব বাড়তে থাকায় একাধিকবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। আজ এটি বহুতল ভবনে রূপ নিয়েছে এবং কলম্বোর অন্যতম পরিচিত স্থাপত্যে পরিণত হয়েছে।

স্থাপত্যের দিক থেকে লাল মসজিদ সত্যিই অনন্য। এখানে ব্যবহৃত হয়েছে ইন্দো-সারাসেনিক শৈলী, যা ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যের মিশ্রণ। গম্বুজ, মিনার, খিলান আর ডোরা কাটা দেয়ালের সমন্বয় একে করেছে মনোমুগ্ধকর। প্রচলিত ধারণা আছে, এর মিনারের গঠন ডালিম ফলের অনুপ্রেরণায় করা হয়েছিল। যদিও ইতিহাসবিদরা এ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন, তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, মিনারের আকার সত্যিই ডালিমের সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ।

লাল মসজিদ শুধু স্থাপত্যের জন্য নয়, ধর্মীয় জীবনধারার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। জুমার দিনে মসজিদটি ভরে ওঠে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে। ভেতরের অংশও সুন্দরভাবে সাজানো। অজুখানা, নামাজের স্থান এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য স্থানীয় মুসল্লিরা এখানে সমবেত হন আর আজানের ধ্বনি বাজারের কোলাহল ভেদ করে প্রতিধ্বনিত হয়ে যায় চারদিকে।

মসজিদটির বিশেষত্ব এখানেই শেষ নয়। এক সময় ভারত মহাসাগরে যাতায়াতকারী নাবিকরা কলম্বো বন্দরের দিকে আসার সময় দূর থেকে লাল মসজিদের লাল-সাদা মিনার দেখে দিকনির্দেশনা নিতেন। কলম্বোর আকাশরেখায় আজও মসজিদটির উপস্থিতি তেমনি দিকনির্দেশক ও পরিচয়ের প্রতীক হয়ে আছে।

শ্রীলঙ্কায় মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ। সংখ্যায় সংখ্যালঘু হলেও তারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। মুসলিমরা এখানে মুর সম্প্রদায় নামে পরিচিত, যারা মূলত আরব ও দক্ষিণ ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বংশধর। পুরো দেশে আড়াই হাজারেরও বেশি মসজিদ রয়েছে, শুধু রাজধানী কলম্বোতেই নিবন্ধিত মসজিদের সংখ্যা শতাধিক। তাদের ধর্মীয় চর্চা বেশ উন্মুক্ত, এমনকি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিওতে নিয়মিতভাবে আজান সম্প্রচার করা হয়, যা অনেক অমুসলিম দেশের জন্য বিরল বিষয়।

তবে শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেই নয়, লাল মসজিদ আজ কলম্বোর অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রও। প্রতিদিন শত শত পর্যটক আসে এর অনন্য স্থাপত্য দেখতে। অবশ্য দর্শনার্থীদের জন্য কিছু নিয়ম রয়েছে। শালীন পোশাক পরিধান করা বাধ্যতামূলক, মহিলাদের মাথা ঢেকে প্রবেশ করতে হয় এবং ভেতরে গিয়ে ধর্মীয় পরিবেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হয়। এসব নিয়ম মেনে চললে পর্যটকরা কাছ থেকে দেখতে পারেন শ্রীলঙ্কার মুসলিম ঐতিহ্যের এক দুর্লভ নিদর্শন।

শ্রীলঙ্কা নানা সময়েই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে। সাম্প্রতিক মুসলিমবিরোধী সহিংসতা দেশটির পর্যটন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অথচ দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শেষে যখন দেশটি শান্তির পথে এগোচ্ছিল, তখন পর্যটন ছিল অন্যতম প্রধান ভরসা। স্থানীয়রা মনে করেন, লাল মসজিদের মতো ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলো আসলে শ্রীলঙ্কার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রতীক। এগুলো শুধু ধর্মীয় নিদর্শন নয়, বরং সহাবস্থান ও সহনশীলতার প্রতীকও বটে।

লাল মসজিদ কলম্বোর কোলাহলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দন। লাল-সাদা ডোরা কাটা দেয়াল, আকাশচুম্বী মিনার আর প্রতিদিনের আজানের ধ্বনি যেন শহরের প্রাণের সঙ্গে মিশে গেছে। এটি কেবল একটি মসজিদ নয়, বরং ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি আর স্থাপত্যের মেলবন্ধনে তৈরি এক অনন্য নিদর্শন। কলম্বো ভ্রমণে এলে লাল মসজিদ দেখা মানে শুধু একটি ভবন দেখা নয়, বরং অনুভব করা শ্রীলঙ্কার শতবর্ষী ঐতিহ্য ও সহাবস্থানের গল্প।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত