তো  মা  দে  র   ব  ই

যার নামই স্লোগান জীবন বিপ্লবের খেরোখাতা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:০৩ এএম

একই আকাশের নিচে সব মানুষের বাস হলেও সবাই একই রকম জীবনযাপন করে না। অতিভোজনের জন্য কারও হয়তো খাদ্যগ্রহণ নিষেধ আর কারও হয়তো খাবার নেই খাওয়ার। আদিম সমাজে এই সমস্যা ছিল না। তখন গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে সবাই একসঙ্গে শিকার করত আর সবাই একসঙ্গে খাবার খেত। কিন্তু ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থার উদ্ভব, উত্তরণ ও পরিবর্তনের মাধ্যমে সভ্যতা এমন একটি অবস্থায় এলো যেখানে, সমাজের অধিকাংশ সম্পদ গোটাকতক ব্যক্তি বা পরিবারের কুক্ষিগত হয়ে পড়ল। সৃষ্টি হলো বৈষম্য। এই সীমাহীন বৈষম্যের সমাপ্তি টানতে শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন দেখে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মানুষ অন্যদের সংগঠিত করতে চেয়েছেন, শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, শোষকের হাতিয়ারের ভয় না করে গড়ে তুলেছেন প্রতিরোধ। তারাই বিপ্লবী। আর এই বিপ্লবীদের মধ্যে আর্নেস্তো গুয়েভারা ডি লা সেরনা অন্যতম, সারা বিশে^র বিপ্লবীদের কাছে যিনি আর্নেস্তো চে গুয়েভারা বা চে নামে সর্বাধিক পরিচিত। সারাজীবন ধরে একটি সাম্যবাদী পৃথিবী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন চে। প্রবল সংগ্রামের পর কিউবায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগও করেন। কিন্তু তিনি ভুলে যাননি গোটা লাতিন আমেরিকাই তার স্বদেশভূমি, কোনো সীমারেখাতে তার বসবাসের স্থান আবদ্ধ নয়। সে কারণে তিনি কিউবা থেকে পালিয়ে বলিভিয়ায় যান এবং সম্মুখসমরে নিহত হন। নিশ্চিত সুখবাস থেকে নিশ্চিত মৃত্যুর পথে যাত্রা করা এই মানুষটির নাম সারা বিশ্ব জুড়ে হয়ে উঠেছিল মুক্তির সেøাগান, তার জীবনের ধারাবাহিক পথক্রমা স্বীকৃতি পেয়েছে একজন বিপ্লবীর গড়ে ওঠার দিকনির্দেশনা, খেরোখাতা হিসেবে। চে গুয়েভারার জীবন ও আদর্শ ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক কাজল ঘোষ তার ‘চিরবিপ্লবী চে’।

‘চিরবিপ্লবী চে’ বইটি আর দশটি জীবনীগ্রন্থের মতো নয়। বিখ্যাত বা কীর্তিমান ব্যক্তির জন্ম, বেড়ে ওঠা প্রভৃতির সাধারণ বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বইটি। চে গুয়েভারার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বিপ্লবী জীবনের সংগ্রামের বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, কীভাবে বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তি দেশগুলোতে শোষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিল তার বিশদ আলোচনা। ফলে পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন নিজের দেশের মানুষকে মুক্ত করতে চে গুয়েভারাসহ লাখো তরুণ কেন সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছিল।

অথচ একটি সাধারণ জীবনই চেয়েছিলেন বাবা-মা চে’র জন্য। পরিবারের বড় সন্তান আর্নেস্তো গুয়েভারা। তার পরে জন্ম নেয় দুই ভাইবোন সিলিয়া ও রবার্তো। জন্মের দুই বছরের মধ্যেই হাঁপানির উপসর্গ দেখা যায়। বাবা-মা চেয়েছিলেন আর্নেস্তো যেন বড় হয়ে নিজের যতœ নিজেই করতে পারে সেজন্য তাকে ডাক্তার বানাতে। হাঁপানির রোগাক্রান্ত ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আহামরি কোনো বোনেননি তারা। একজন ডাক্তারের সাধারণ জীবন। কিন্তু বাবা-মায়ের অভ্যাস, পঠনপাঠন আর দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে এমনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছিল যে, পরিণত বয়সে হয়েছিলেন পৃথিবী কাঁপানো বিপ্লবী। মা সিলিয়া ডি লা সেরনা আর পাঁচজন গৃহিণীর মতো ছিলেন না। ঘরসংসার সামলানোই নিজের একমাত্র কর্তব্য বলে মনে করতেন না। প্রচুর বই পড়তেন। বই দিয়ে বাড়ি ভরে ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই চে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বইয়ে ডুবে থাকতে। মা চমৎকার ফরাসি বলতে পড়তে পারতেন। তার কাছ থেকেই চে শিখেছিলেন ফরাসি ভাষা। বাবা ছিলেন আত্মভোলা স্থপতি। স্বাপ্নিক মানুষ। সঞ্চয়ে বিশ্বাস করতেন না। অন্ধবিশ্বাস ছিল না। তখন আর্জেন্টিনা ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আর্নেস্তোর বাবা ছিলেন সে কুসংস্কারপ্রিয়। স্কুলে তিনি অনুমতি নিয়ে লিখেছেন যেন। আর্নেস্তোকে ধর্মীয় ক্লাস না করতে হয়। একদিকে বইয়ের মাধ্যমে বিশে^র মহান মনীষীদের চিন্তা ও কাজের সঙ্গে চের পরিচয় হয় এবং আরেক দিকে কুসংস্কারের টিকিটি স্পর্শ করতে না পারায় ছোটবেলা থেকেই চে মানবিক ও যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে থাকেন। শিক্ষাজীবনেই চে অনুভব করেন পৃথিবীটাকে জানতে বুঝতে হলে শুধু বইয়ের পাতায় ডুবে থাকলে হবে না দেখতে হবে নিজের চোখে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনাকে অনুভব করতে হবে কাছ থেকে। সেজন্য বন্ধুর সঙ্গে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দেশ-দেশান্তরে। তার বাবা এই ভ্রমণ সম্পর্কে লিখেছেন, আমি তখন বুঝতে পারিনি যে তার এই ভ্রমণের আগ্রহ প্ররকৃতপক্ষে জানা ও শেখার আগ্রহেরই আরেকটি দিক। সে জানত যে, দরিদ্র মানুষদের প্রয়োজন সম্বন্ধে বিশদভাবে জানতে গেলে পৃথিবী ভ্রমণ করতে হবে।... পথের প্রতিটি বাঁকে মানুষের যন্ত্রণার অংশীদার হতে হবে এবং কারণগুলোকেও খুঁজে বের করতে হবে। আর্নেস্তোর সফর ছিল এক ধরনের সামাজিক গবেষণা, সরেজমিন তদন্ত ও সেই সঙ্গে দুঃখী মানুষের যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা।‘ এই ভ্রমণ চে গুয়েভারাকে এতটাই পাল্টে দেয় যে তিনি সারাজীবনের জন্য বিপ্লবীর জীবন বেছে নেন। এমন বিপ্লবী যে, মৃত্যুর পরে কিউবার আরেক জগদ্বিখ্যাত বিপ্লবী বলতে বাধ্য হন, আমাদের সন্তানরা কার মতো হয়ে উঠলে আমরা খুশি হব এ প্রশ্ন উঠলে বিপ্লবী হিসেবে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আমরা উত্তর দেব, ওরা যেন চে’র মতো হয়।

সেই চিরবিপ্লবী চের জীবনী এই বইটি তোমাদের ভালো লাগবে।

সুলতানা রাজিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত