ইনসাফের অনন্য দৃষ্টান্ত নবীজির বিচারব্যবস্থা

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩৭ এএম

ইতিহাসের প্রত্যেক মহান ব্যক্তি তার নেতৃত্বগুণ এবং শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়। এক্ষেত্রে নবী করিম (সা.) ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে অতুলনীয় মহামানব। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়জীবন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তিনি শান্তি, শৃঙ্খলা ও সফলতার এমন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। আল্লাহর পাঠানো রাসুল হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, সামাজিক পরিমণ্ডলের একজন আদর্শ সমাজপতি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। বিশেষত তার বিচারব্যবস্থায় ছিল ন্যায়, ইনসাফ ও মানবাধিকারের এমন অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শতভাগ ন্যায়বিচার পেত।

সবার জন্য ন্যায়বিচার : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিচারব্যবস্থার মূলভিত্তি ছিল মহান আল্লাহর নির্দেশনা। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছিলেন। নবীজির বিচারালয়ে কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না। ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সবার ওপর সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা হতো। বিচারকাজের নীতি ছিল ইনসাফ, সমতা ও মানবতার সমন্বয়ে গঠিত। ফয়সালা হতো সাক্ষ্য, প্রমাণ ও সততার ভিত্তিতে। আরব সমাজে নারীরা বিচার ও অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। নবীজি (সা.) এ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করে নারীদের উত্তরাধিকার, বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছিলেন।

দাসদাসীর সঙ্গে আচরণ : রাসুলুল্লাহ (সা.) দাসদাসীর সঙ্গে কঠোর আচরণ বন্ধ করার এবং তাদের প্রতি সদয় হওয়ার শিক্ষা প্রদান করেন। তাদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের জন্য তিনি এ ঘোষণা করেন যে, ‘তোমাদের গোলামরা তোমাদের ভাই। মহান আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং কারও ভাই যদি তার অধীনে থাকে, তবে সে যা খায়, তা থেকে যেন তাকে খেতে দেয় এবং সে যা পরিধান করে, তা থেকে যেন তাকে পরতে দেয়। সাধ্যাতীত কোনো কাজে তাদের বাধ্য করো না। যদি কষ্টকর কোনো কাজ তাদের করতে দাও, তবে তোমরাও তাদের (সে কাজে) সহযোগিতা করো।’ (সহিহ বুখারি ২৩৭৭)

অমুসলিমদের অধিকার : অমুসলিমদের অধিকার নিশ্চিত করতে নবীজির দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ছিল, ‘যে কেউ আমাদের সঙ্গে সন্ধিবদ্ধ অমুসলিমের ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, সামর্থ্যরে বাইরে কোনো দায়িত্ব তার ওপর চাপিয়ে দেবে কিংবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বস্তু তার থেকে (জোরপূর্বক) ছিনিয়ে নেবে, আমি কেয়ামতের দিন ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে (আল্লাহর আদালতে) অভিযোগ দায়ের করব।’ (সুনানে আবু দাউদ ৩০৪১)

অপরাধ দমনে নৈতিক শিক্ষা : নবীজি (সা.)-এর বিচারব্যবস্থায় শাস্তি প্রদানই মূল উদ্দেশ্য ছিল না, বরং অপরাধ দমনে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করাও ছিল অন্যতম লক্ষ্য। তিনি মানুষকে আল্লাহভীতি, তাকওয়া, অধীনস্ত মানুষ, পশুপাখি, জীব-উদ্ভিদসহ সবার প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দিয়েছিলেন। ফলে মানুষের অপরাধ প্রবণতা নেমে এসেছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।

সাম্প্রতিক বিশ্বের বিচারব্যবস্থায় যে দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব, প্রহসন ও অন্যায়-অবিচার আমরা দেখি, এগুলোকে নবীজির ন্যায়বিচারের সঙ্গে তুলনা করলে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তার বিচারনীতি কতটা উন্নত, সর্বজনীন এবং মানুষের জন্য কল্যাণকর ছিল। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের যেকোনো শাখায় নবীজির বিচারনীতির দৃষ্টান্ত অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়। আজকের বিশ্ব যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিচারব্যবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, তবে সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য ও অশান্তি দূর হয়ে ন্যায়, ইনসাফ, সমতা ও শান্তি ফিরে আসবে বলে নিশ্চয়তা দেওয়া যায়।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত