ডিলারদের মতামত ছাড়াই ডিলারশিপ নীতিমালা!

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:১২ এএম

সারা দেশে সার বিক্রিতে জড়িত ডিলারদের সিন্ডিকেট ভাঙতে কৃষি মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করেছে নতুন নীতিমালা। ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫’ নামে এই নীতিমালা অনুমোদন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে নতুন নীতিমালায় ডিলারদের পরিচালন ব্যয় বাড়লেও কমিশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি নীতিমালা করতে বর্তমান ডিলারদের মতামত নেওয়া হয়নি বা এ সংক্রান্ত সভায় তাদের আমন্ত্রণও জানানো হয়নি।

নতুন এই নীতিমালা আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তবে বোরো মৌসুমে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে সার সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘সার বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটির’ সভায় এই নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় কমিটির আহ্বায়ক স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের প্রশাসকসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই নীতিমালা ২০০৯ সালের সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত নীতিমালার প্রতিস্থাপন করবে।

জানা গেছে, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নে তিনজন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিটি ডিলারের তিনটি করে বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে, যেখানে আগে একটি বিক্রয়কেন্দ্র ছিল। বিক্রয়কেন্দ্রগুলোয় সরকারি মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হবে। নতুন ডিলার নিয়োগের পর খুচরা সাব-ডিলাররা আর সার বিক্রি করতে পারবেন না।

একই সঙ্গে, ডিলারদের জন্য নিরাপত্তা জামানত ২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থাপনায় ডিলারশিপ পরিচালনার খরচ বাড়লেও কমিশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। কমিশন আগের মতোই প্রতি কেজিতে ২ টাকা রাখা হয়েছে।

সরকারের দাবি, সারা দেশে খুচরা ব্যবসায়ী ও ডিলারদের যোগসাজশে সারের দাম বাড়ে, ফলে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার কিনতে পারেন না। নতুন ব্যবস্থাপনায় এই সমস্যা দূর হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিলারদের দৌরাত্ম্য কমাতে এবং কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে না হয়, সেই সঙ্গে বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।’

বর্তমান নীতিমালায় বিসিআইসি ও বিএডিসির মাধ্যমে ডিলারশিপ দেওয়া হয়। বিসিআইসির ডিলাররা ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার বিক্রি করেন, তবে বিএডিসির ডিলাররা শুধু নন-ইউরিয়া সার বিক্রি করেন। নতুন নীতিমালায় সব ডিলার কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকবে এবং সব ধরনের সার বিক্রি করবে।

জানা গেছে, বর্তমানে বিসিআইসির ৫ হাজার ৬০০ এবং বিএডিসির ৫ হাজার ২০০ ডিলার রয়েছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্ত করা হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, একই পরিবারের সদস্যদের তিনটি পর্যন্ত ডিলারশিপ পাওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। এসব ক্ষেত্রে একটি লাইসেন্স রেখে বাকিগুলো বাতিল করা হবে। অনিয়মে জড়িত ডিলারদের লাইসেন্সও বাতিল হবে। নতুন নীতিমালায় ডিলারের সংখ্যা বাড়বে এবং বাতিলকৃত ডিলারদের স্থানে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। ডিলার নিয়োগের জন্য সারা দেশে আবেদন আহ্বান করা হবে। আবেদন উপজেলা কৃষি অফিসে জমা দিতে হবে। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করে তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে, যারা চূড়ান্তভাবে ডিলার নিয়োগ করবে।

জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে বিসিআইসি প্রথম ৫ হাজার ডিলার নিয়োগ করে। ১৯৯৬-২০০০ সালের মধ্যে আরও প্রায় ৮০০ ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৭-০৮ সালে বিএডিসি ৫ হাজার ২০০ ডিলার নিয়োগ করে। এখনো এই ডিলারদের মাধ্যমে সার বিতরণ চলছে। ‘সারবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি’ তিনটি সভার মাধ্যমে এই নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু কোনো সভায় বর্তমান ডিলারদের মতামত নেওয়া হয়নি বা তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। গত ৩০ সেপ্টেম্বরের সভায় বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের কিছু সদস্যকে ডাকা হলেও তাদের বের করে দেওয়া হয়। সভায় শুধু অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সচিব ও প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন। অ্যাসোসিয়েশন নতুন নীতিমালায় ডিলারদের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি উত্থাপন করে। কমিটি তখন কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কমিশন দ্বিগুণ করতে সরকারের ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে। তবে ডিলাররা দীর্ঘদিন ধরে কমিশন বাড়ানোর দাবি করলেও সরকার তাতে সম্মত হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনটি দোকান ও গোডাউন পরিচালনায় ব্যয় বাড়বে। কিন্তু সরকার পুরনো ২ টাকা কমিশন দিয়েই এটি চালাতে চায়। এতে সার বিক্রিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।’

কৃষি মন্ত্রণালয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে চায়। তাদের মতে, এখন বাস্তবায়ন না হলে কোনো রাজনৈতিক সরকার এটি করতে চাইবে না। তবে বোরো মৌসুমে, যখন সারের চাহিদা সর্বোচ্চ, এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করলে ডিলারশিপ পরিবর্তন ও সার সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত