কোটি কোটি টাকা আয় নিরাপত্তা ব্যয়ে নারাজ

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৪৩ এএম

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নানা খাত থেকে বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করে জেলা প্রশাসন পরিচালিত বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি। কিন্তু সেই টাকা পর্যটকের নিরাপত্তায় ব্যয় করতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা। ফলে দাতা সংস্থার অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় সমুদ্রে গোসলে নামা পর্যটকের জীবন রক্ষাকারী লাইফ গার্ডের কার্যক্রম নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। যদিও আগামী তিন মাস বকেয়া বেতনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সি সেইভ লাইফ গার্ড।

জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার দেওয়া তথ্য বলছে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের হাজারের অধিক কিটকট, ৫ শতাধিক ফটোগ্রাফার, আট শতাধিক খাবার ও আচারের দোকান, দুই শতাধিক টিউব, ডজনখানেক লকার, ৬০টি বিচ বাইক, ৬২টি ওয়াটার বাইকসহ নানা প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়ে বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করে বিচ ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু ওই কমিটির কয়েকজন বিচকর্মীর বেতন দেওয়া ছাড়া পর্যটনের উন্নয়নে দৃশ্যমান কোন কাজ করে না। 

জানা গেছে, ২০১২ সাল থেকে কক্সবাজার সমুদ্রে  গোসলে নামা  পর্যটকের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করে সি সেইভ লাইফ গার্ড।  সেই থেকে বিগত ১৩ বছরে দাতা সংস্থা রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট (আরএনএলআই) অর্থায়নে পরিচালিত  লাইফ গার্ড সদস্যরা ৮২৪ পর্যটককে উদ্ধার করে। তবে দাতা সংস্থার অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ওই বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে লাইফ গার্ডের কার্যক্রম চলমান রাখার দাবি জানিয়েছেন পর্যটনসেবীরা।

সি সেইফ লাইফ গার্ড সংস্থার টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, গত মঙ্গলবার দাতা সংস্থার অর্থায়ন শেষ হয়েছে। তবুও আমরা কাজ বন্ধ করছি না। আপাতত আমরা  জেলা প্রশাসনের  আশ্বাসের কারণে আগামী তিন মাস বকেয়া বেতনে কাজ করে যাব।

তিনি আরও বলেন ‘২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই এ প্রকল্পের কাজ শেষ  হয়। তবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের অনুরোধে দাতা সংস্থাটি দুই দফায় আরও ৯ মাস প্রকল্পটি পরিচালনা করে। এবারও দাতা সংস্থাকে অনুরোধপত্র দিয়েছে জেলা প্রশাসন। 

তিনি বলেন, সি সেইফ লাইফ গার্ড সংস্থা ২৭ জন কর্মী দিয়ে লাইফ গার্ড কার্যক্রমটি পরিচালনা করে আসছিল। এটি পরিচালনার জন্য প্রতি মাসে ব্যয় হয় ১৪ লাখ টাকা। আবাসিক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে এই অর্থ দিতে পারে। এর বিনিময়ে সৈকতের বালিয়াড়িজুড়ে আমরা আবাসিক প্রতিষ্ঠানসমূহের নাম, যোগাযোগ নম্বরসহ নানা বিষয়ে তুলে ধরে প্রচার করতে পারি।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য বলছে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পর্যটন ২ শাখার যুগ্মসচিব এ কে এম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি স্মারকপত্রে গত ২৭ আগস্ট লাইফ গার্ড পরিচালনাসহ ২টি নিদের্শনা প্রদান করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হোটেল/মোটেল/গেস্টহাউস/রিসোর্ট মালিকদের লাইফগার্ড নিযুক্ত করে তাদেরকে বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম জানান, লাইফ গার্ড কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। আগামী ৩ মাস স্বাভাবিক থাকবে। এর মধ্যে দাতা সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনামতে আবাসিক প্রতিষ্ঠান মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী অর্থ সংগ্রহ করা হবে।

তবে মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে অবাস্তব দাবি করে কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন,  বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির নিজস্ব ফান্ড রয়েছে। প্রতিবছর  তারা সৈকত থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করে। তারা চাইলেই সেই ফান্ড থেকে স্থায়ীভাবে লাইফ গার্ডটি চালাতে পারে। এটাই হওয়া উচিৎ। ওখানে যদি  আমাদের অল্প সহযোগিতা লাগে সেটা আমরা দিতে পারি। তবে পুরো ফান্ড আমাদের দেওয়া সম্ভব নয়।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজের অর্থায়নে লাইফ গার্ড চালুর সিদ্ধান্তকে হঠকারী দাবি করে  ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক)-এর আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিল্কী বলেন,  ‘বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও এলআর ফান্ড থেকে আদায়কৃত অর্থের সঠিক হিসাব কোথায়? এ দুটি ফান্ডেই লাইফ গার্ড সেবার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। জেলা প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে বিচকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী এবং কক্সবাজারে আগত গ্রুপ পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে। তাহলে সেই টাকা কী শুধু আপেল-কমলা খাওয়ার জন্য?’

মিল্কী আরও জানান, দেশের অন্যান্য পর্যটন গন্তব্যের তুলনায় কক্সবাজারের হোটেল ভাড়া এমনিতেই বেশি। এখন যদি লাইফ গার্ড সার্ভিসের অজুহাতে হোটেল-মোটেল থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়, তবে এর বোঝা পর্যটকদের ওপর পড়বে। এতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কে সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার রায়হান উদ্দিন বলেন, যেকোনোভাবে লাইফ গার্ডের কার্যক্রম স্থায়ী করা হবে। এর জন্য আমরা সঙ্গে লাইফ গার্ড সদস্যদের কথা হয়েছে। আমরা আপাতত চেষ্টা করছি ফান্ড সংগ্রহের। যদি ব্যর্থ হয় তবে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির নিজস্ব অর্থায়নে লাইফ গার্ড পরিচালনা করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত