স্বপ্নের বীজ শিক্ষকরাই বুনে দিয়েছেন

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৩৮ এএম

মানুষের জীবনে অনেক সম্পর্ক আসে, যায়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক থাকে নিঃশব্দে, অন্তরের গভীরে যাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার জীবনে সেই সম্পর্কের নাম শিক্ষক। শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি এক ধরনের দায়বদ্ধতা। আর সেই দায়বদ্ধতার গভীর প্রভাব আমি ছাত্র হিসেবেও পেয়েছি, আবার শিক্ষক হিসেবে নিজেও বুঝেছি।

আমার জীবনে শিক্ষকদের ভূমিকা এতটাই গভীর যে, তাদের ছাড়া আমার পরিচয়টাই যেন অসম্পূর্ণ। কলেজ জীবনে আমি বিভিন্ন স্কিল কম্পিটিশনে অংশ নিতাম। প্রতিবার বিজয়ী হওয়ার পর শিক্ষকদের উৎসাহ আমার ভেতরে নতুন শক্তি জাগাত। তাদের অনুপ্রেরণাতেই আমি লিডারশিপ, ম্যানেজমেন্ট, কমিউনিকেশন আর পাবলিক স্পিকিং এমন নানা দক্ষতার ভেতর নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছি।

কিন্তু জীবনের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল চীনে পড়াশোনার সময়। সেদিন ছিল ঈদের দিন। পরিবার থেকে দূরে থাকায় মন খারাপ ছিল ভীষণ। হঠাৎ আমার এক শিক্ষক তযধহম ঢঁ ফোন করে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের গেইটে যেতে। সেখানে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম, তিনি আমার জন্য সারপ্রাইজ নিয়ে হাজির। সারা দিন গাড়ি নিয়ে আমাকে ঘুরিয়েছেন, খাওয়ালেন, সঙ্গে সঙ্গে জীবনের অনেক মূল্যবান শিক্ষা দিলেন। এক অচেনা দেশে, প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতায়, সেই শিক্ষক আমার কাছে হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের সদস্য। আমি যখন ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে আসি, আজও চোখে ভাসে সেই দৃশ্য, মেট্রো স্টেশনে আমার শিক্ষক তযধহম ঢঁ অঝোর নয়নে কাঁদছেন। মুহূর্তটি এখনো আমার কাছে একেবারে জীবন্ত।

আবার আরেক শিক্ষক ছিলেন ডধহম ঐড়হম, তিনি যদি কোনো বিষয় বারবার চেষ্টা করেও বোঝাতে না পারতেন, তাহলে কেঁদে ফেলতেন। তিনি বলতেন ‘এটা হয়তো আমার ব্যর্থতা, তুমি বোঝোনি, কারণ আমি বোঝাতে পারিনি।’ একজন শিক্ষকের এই বিনয় আমাকে শিখিয়েছে ব্যর্থতা আসলে ভয় পাওয়ার কিছু নয়, বরং শেখার অংশ।

আমার ভেতরে যে স্বপ্নগুলো জন্ম নিয়েছে, তার বীজ কোথাও না কোথাও শিক্ষকরাই বুনে দিয়েছেন। কেউ শিখিয়েছেন ধৈর্য, কেউ শিখিয়েছেন সততা, কেউ আবার শিখিয়েছেন ভুলকে ভয় না পেতে। আজ বুঝি, আমার স্বপ্ন দেখার চোখ, লড়াই করার শক্তি, কিংবা ব্যর্থতার মধ্যেও আশায় টিকে থাকার সাহস সব কিছুর পেছনে আছে শিক্ষকদের অদৃশ্য ছায়া। তারা হয়তো এখন আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে পাশে নেই, কিন্তু তাদের বলা কথাগুলো, তাদের দেখানো পথ, তাদের দেওয়া উৎসাহ আজও আমার ভেতরে আলো হয়ে জ্বলছে। আর সেই আলোকেই আমি নতুন করে দাঁড়াই, নতুন স্বপ্ন দেখি, নতুন যাত্রা শুরু করি।

আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার পেছনে আমার শিক্ষকদের হাত সবচেয়ে বেশি। শিক্ষক দিবসে তাই আমি শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়, গভীর শ্রদ্ধা জানাতে চাই। আমার প্রতিটি সাফল্যের ভেতরে তাদের পরিশ্রম, উৎসাহ আর ভালোবাসার অদৃশ্য ছাপ অমলিন হয়ে আছে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পাঠগৃহ অ্যাকাডেমি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত