পাঁচশ কোটির সড়ক পাঁচ মাস থাকে অকেজো

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:২৮ এএম

নেত্রকোনার পাহাড়ি সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। এই পাহাড়ি অঞ্চলের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকলেও নতুন সীমান্ত সড়ক নির্মাণে কিছুটা গতি সঞ্চারিত হয়েছে। কিন্তু চারটি নদীর ওপর সেতু নির্মাণ না হওয়ায় সীমান্তের প্রায় লাখখানেক বাসিন্দা এর পূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত। ফলে বর্ষার অন্তত পাঁচ মাস সেতুর অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার এই সীমান্ত সড়ক।

২০২০ সালে ময়মনসিংহের হালুঘাট থেকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা এবং সুনামগঞ্জের মহিষখলা পর্যন্ত ৭৬ কিলোমিটার সীমান্ত সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৫৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সড়কের কাজ ২০২৩ সালে সম্পন্ন হয়। তবে নেতাই, সোমেশ্বরী, গণেশ্বরী এবং মহাদেও নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শুষ্ক মৌসুমে কাঠের সেতু দিয়ে ছোট যানবাহন ও স্থানীয়রা পার হলেও বর্ষায় তীব্র স্রোতে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

কলমাকান্দা উপজেলার মহাদেও নদী শুষ্ক মৌসুমে শান্ত থাকলেও বর্ষায় মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনা ও ঢলের পানিতে খরস্রোতা হয়ে ওঠে। ফলে স্থানীয়দের পারাপারের একমাত্র ভরসা ছোট ডিঙি নৌকা। পানি কম থাকলে পায়ে হেঁটে নদী পার হতে হয়। বর্ষার চার থেকে পাঁচ মাস এমন দুর্ভোগ তাদের নিত্যসঙ্গী। পাহাড়ি সীমান্ত এলাকা হওয়ায় পাঁচগাঁও, পাতলাবনের মতো দর্শনীয় স্থানে প্রতিদিন পর্যটকরা ভিড় করেন। কিন্তু নদী পারাপারের সুবিধা না থাকায় তারা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়েন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল পারাপারে বিড়ম্বনার শেষ নেই। নৌকা ডুবে দুর্ঘটনাও ঘটছে প্রায়শই। ফলে বর্ষায় পর্যটকের সংখ্যা ক্রমশ কমছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, সীমান্ত সড়কের চারটি নদীর ওপর পাঁচটি জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণের জন্য একটি ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এতে দেশীয় বিনিয়োগ ৮৯৫ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ২ হাজার ৮৫০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নেত্রকোনা অংশে চারটি সেতুর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সোমেশ্বরী নদীর ওপর দুটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে একটি সীমান্ত সড়কে এবং অন্যটি দুর্গাপুর-শ্যামগঞ্জ সড়কের বিরিশিরি অংশে। এই দুটি সেতুর জন্য যথাক্রমে ৪৪১ কোটি ২ লাখ টাকা এবং ১ হাজার ৪৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া মহাদেও নদীতে ৪৫৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং গণেশ্বরী নদীতে ৪২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকার সেতু নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছে।

মহাদেও নদীর তীরবর্তী বাসিন্দা রিচিল সাংমা বলেন, ‘মহাদেও নদীর ওপর সেতু না থাকায় স্থানীয় থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পাহাড়ি নদী হওয়ায় হঠাৎ ঢলে নদী ভরে গেলে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হয়। শুনেছি, নতুন সীমান্ত সড়কের জন্য এই নদীতে সেতু হবে, কিন্তু আট-দশ বছরেও এর কোনো উদ্যোগ দেখছি না। সেতু হলে চলাচলে সুবিধা হবে, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

সোমেশ্বরী নদীর বারইকান্দি এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্ত সড়ক নির্মাণে পাহাড়ি এলাকার চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি এসেছে। এখন জামালপুর থেকে সুনামগঞ্জের মহিষখলা পর্যন্ত মোটরসাইকেলে যাওয়া যায়। কিন্তু চারটি নদীর ওপর সেতু না থাকায় এই সড়কের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে শুনছি সেতু নির্মাণ হবে, জায়গাও নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বর্ষায় এই সড়কে চলাচলে দুর্ভোগ হয়। নৌকায় পারাপারের কারণে বর্ষায় এই সড়ক তেমন কেউ ব্যবহার করে না। সড়ক হওয়ায় পর্যটক বেড়েছে, তবে বর্ষার দুর্ভোগে তাদের সংখ্যা কমছে।’

নেত্রকোনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ আলনূর সালেহীন জানান, ‘নেত্রকোনা অংশের সীমান্ত সড়কের কাজ শেষ হয়েছে। সোমেশ্বরী, মহাদেও ও গণেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণের জন্য সব প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়েছে। সমীক্ষা, যাচাই ও স্থান নির্ধারণ প্রায় শেষ। সেতু নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে, যার বাজেট প্রায় ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আশা করি, শিগগিরই প্রক্রিয়া শেষ করে নির্মাণকাজ শুরু হবে। সেতু নির্মিত হলে দুর্ভোগ কমবে এবং পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘সীমান্ত সড়কের চারটি সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে জামালপুর থেকে সুনামগঞ্জের তাহেরপুর পর্যন্ত সরাসরি যাতায়াত সহজ হবে। এতে সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি সেতু থেকে টোলের মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত