বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) চিঠি দিয়েছে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক। গত ১৩ আগস্ট দেওয়া ওই চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশকে পয়েন্ট অব প্রেজেন্স (পপ) হিসেবে বিবেচনা করে পার্শ্ববর্তী পপ ও দেশগুলোতে সেবা প্রদানের জন্য ব্যান্ডউইথ নিতে চায় তারা। এজন্য বাণিজ্যিকভাবে ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিজড সার্কিট (আইপিএলসি) এবং আনফিল্টারড আইপি (নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট সংযোগ) ব্যবহারের অনুমোদন চেয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ এনে মোবাইল অপারেটর এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইএসপি) মাধ্যমে মানুষকে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা হয়। অন্যদিকে, স্টারলিংক স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করে। তাদের ইন্টারনেট সেবা জিওস্টেশনারি (ভূস্থির উপগ্রহ) থেকে আসে, যা ৩৫ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্থাপিত হাজার হাজার স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে গঠিত স্টারলিংক, যা বিশ্বব্যাপী উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান করতে সক্ষম।
বিটিআরসিকে দেওয়া চিঠিতে স্টারলিংক জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের পপ থেকে সিঙ্গাপুর ও ওমানে নিজেদের পপের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য আইপিএলসি চালু করতে চায়। তাদের প্রতিটি পপ অন্তত দুটি পপের সঙ্গে আন্তঃসংযুক্ত। তারা এই আইপিএলসির মাধ্যমে ‘আনফিল্টারড’ (নিয়ন্ত্রণহীন) আইপি ট্রানজিট ব্যবহার করবে, যা বাংলাদেশের স্থানীয় ট্রাফিকের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তারা বাংলাদেশের জন্য স্থানীয় নীতি মেনে চলবে।
এই আইপিএলসি সংযোগগুলো বাংলাদেশের স্থানীয় বা অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে না বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্টারলিংক জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রতিটি ব্যবহারকারী স্থানীয় ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) এবং স্থানীয় আইপি ট্রানজিটের মাধ্যমে রাউট হবে। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সব কার্যক্রম নিরাপত্তা, আইনানুগ আড়িপাতা এবং কনটেন্ট ব্লকিং (নিয়ন্ত্রণ) বিধান প্রযোজ্য হবে।
আনফিল্টারড আইপি বাংলাদেশের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ফাইবারঅ্যাটহোম এবং সামিট কমিউনিকেশনস থেকে নেওয়া হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছে স্টারলিংক। এ দুই প্রতিষ্ঠানেরই ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) এবং আইআইজি লাইসেন্স রয়েছে।
স্টারলিংকের এ উদ্যোগকে ট্রানজিট হিসেবে না দেখে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির বিষয় হিসেবে দেখছে বিটিআরসি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করছে। ভারতের ত্রিপুরায় সেই ব্যান্ডউইথ যায়, যার সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। স্টারলিংক এভাবে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করতে চাইলে বিটিআরসি সরকারের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করবে। তবে তার আগে কারিগরি দিক পরীক্ষা করা হবে এবং বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে হবে। স্টারলিংকের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে, কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় স্টারলিংক আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ভারত ও নেপালে স্টারলিংকের সেবা চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। এ অঞ্চলে ভুটানে স্টারলিংক সেবার জন্য ব্যান্ডউইথ সিঙ্গাপুর থেকে আসে। দূর থেকে ব্যান্ডউইথ আনতে গিয়ে সেবার মান খারাপ হয় এবং খরচ বেশি পড়ে। দূরত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ কাছাকাছি। ভুটান ও নেপালের মতো দেশগুলোতে সেবা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ নেওয়া লাভজনক।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ৯ টেরাবাইট, যার মধ্যে অন্তত ৭ টেরাবাইট আনার সক্ষমতা রয়েছে দুটি সাবমেরিন কেবলের। বাকিটা ভারত থেকে ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবলের (আইটিসি) মাধ্যমে আসে। এই মুহূর্তে স্টারলিংককে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করতে হলে দেশের চাহিদা ও সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। কারণ, তাদের বাড়তি ব্যান্ডউইথ দিতে হলে আইটিসির মাধ্যমে ভারত থেকে আনতে হবে। সরকার যদি সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে আনা ব্যান্ডউইথ স্টারলিংককে দিতে পারে, তবে তা লাভজনক হবে। কিন্তু সেই সক্ষমতা আছে কি না, তা একটি প্রশ্ন।
গত ২০ মে থেকে বাংলাদেশে স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট সংযোগের জন্য অর্ডার গ্রহণ শুরু করেছে স্টারলিংক। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে শহুরে গ্রাহকদের কাছে স্টারলিংকের তুলনামূলকভাবে কম সাড়া পড়ছে। কারণ, এর মূল্য অত্যন্ত উচ্চ। এ ছাড়া, ছোটখাটো কারিগরি সমস্যার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের এ স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সেবার মান বাড়াতে বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোর সঙ্গে স্টারলিংক তাদের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক সংযোগের জন্য গাজীপুরের হাইটেক পার্কে দুটি এবং রাজশাহী ও যশোরে একটি করে মোট চারটি স্থানীয় গেটওয়ে স্থাপন করেছে।
