বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন প্রত্যাহার করা না হলে সমন্বয়কদের হত্যা করার নির্দেশ ছিল তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (পরে ক্ষমতাচ্যুত) ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কার্যালয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে প্রাণনাশের হুমকি ও চাপ দিয়েছিলেন তখনকার ডিবিপ্রধান হারুন-অর-রশীদ।
গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষী হিসেবে দেওয়া জবানবন্দিতে এ কথা বলেছেন আন্দোলনে তখনকার সমন্বয়ক এবং বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি আরও বলেছেন, আন্দোলন প্রত্যাহার না করায় তাকে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় জবানবন্দি দেন আসিফ মাহমুদ। তিনি এ মামলার ১৯তম সাক্ষী। গতকাল তার অসমাপ্ত জবানবন্দি শেষে আগামী ১৬ অক্টোবর পরবর্তী জবানবন্দির জন্য দিন ধার্য করে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন বিচারকের ট্রাইব্যুনাল। গতকাল দুপুর ২টার দিকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আসেন আসিফ মাহমুদ। বেলা পৌনে ৩টার দিকে তিনি জবানবন্দি শুরু করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা তিনি জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলা, কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি, আন্দোলনের সমন্বয়কদের ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে গুম করে রাখা, আন্দোলন প্রত্যাহার করতে তাদের ওপর জবরদস্তি ও চাপ প্রয়োগ, চানখাঁরপুলে গুলির ঘটনা প্রত্যক্ষ করাসহ বিস্তারিত তুলে ধরেন। আন্দোলন দমনে ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারী হিসেবে প্রধানত তিনি শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দায়ী করেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৮ জুলাই আন্দোলনের একপর্যায়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আন্দোলন প্রত্যাহার করতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। আমরা কমপ্লিট শাটডাউন অব্যাহত রাখি। সেদিন সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুড়িয়ে তার দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানো হয় এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে ব্লকরেড করে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। এ ছাড়া ব্যাপক মাত্রায় নির্বিচারে গুলিতে ওইদিন শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পান তিনি। তিনি বলেন, ‘ওইদিন গুলশানের নিকেতন এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে ডিবি পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী কিছু লোক আমার মুখম-লে কালো টুপি পরিয়ে তুলে নিয়ে যায়। ওই রাতে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকে আন্দোলন প্রত্যহারে একটি ভিডিও বার্তা প্রদানের জন্য চাপ দেওয়া হয়। আমি রাজি না হলে আমাকে ইনজেকশন পুশ করে অজ্ঞান করে ফেলা হয়। পরে ২৪ জুলাই আমাকে নিকেতনের সেই স্থানে রেখে যায়।’ আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমাকে তুলে নিয়ে যে কক্ষে রাখা হয় তা ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আয়নাঘর পরিদর্শনে গিয়ে বুঝতে পারি যে এটি সেই জায়গা।’
জবানবন্দিতে ডিবি অফিসে সমন্বয়কদের তুলে নিয়ে গুম করা ও আন্দোলন প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিতে থাকে। একপর্যায়ে আমাদের পরিবারের সদস্যদেরও ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। তাদের দিয়ে আমরা সুস্থ আছি মর্মে মিডিয়ায় বক্তব্য প্রচারে বাধ্য করা হয়।’ আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন-অর-রশীদ (ডিবি হারুন) এবং রমনা জোনের ডিসি (উপ-কমিশনার) হুমায়ুন কবীর আন্দোলন প্রত্যাহারে আমাদের ওপর চাপ ও হুমকি প্রদর্শন করতে থাকেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী (তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর (তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। আমাদের বারবার বলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশেই আমাদের তুলে আনা এবং আন্দোলন প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া হচ্ছে। আন্দোলন প্রত্যাহারে রাজি না হলে আমাদের হত্যা করা হবে মর্মে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল। তারা আরও বলেন যে, তারা দয়া করে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।’
চানখাঁরপুল হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষী আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘৫ আগস্ট ভোর থেকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির উদ্দেশ্যে সারা দেশ থেকে সাধারণ জনগণ ঢাকা অভিমুখে আসতে শুরু করে। বেলা ১১টার দিকে আমি, সমন্বয়ক আবু বাকের, মোয়াজ্জেম হোসেন চানখাঁরপুল হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে আসার চেষ্টা করি। চানখাঁরপুল এলাকায় সেদিন আমরা ৪০০-৫০০ আন্দোলনকারী অবস্থান করছিলাম। তখন দেখতে পাই পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা নাজিমউদ্দিন রোডসহ চানখাঁরপুল এলাকায় অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। পুলিশের গুলিতে একের পর এক আন্দোলনকারীকে আহত হতে দেখতে পাই। সেখানে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ টিয়ার শেল, সাউ- গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শটগান ও চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে গুলি করে। আমার সামনে পুলিশের গুলিতে দুজন আন্দোলনকারী নিহত হন। পরে জানতে পারি ওইদিন চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে ছয় আন্দোলনকারী নিহত হন।’
চানখাঁরপুল হত্যাকা-ের এ মামলায় গত ১৪ জুলাই অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। মামলার আসামিরা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, পুলিশের রমনা জোনের সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, সাবেক এসি মো. ইমরুল, শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল মো. সুজন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন এবং কনস্টেবল নাসিরুল ইসলাম। আসামিদের মধ্যে আরশাদ, সুজন, ইমন ও নাসিরুল কারাগারে আছেন। গতকাল শুনানিকালে তাদের হাজির করা হয়। চানখাঁরপুলে পুলিশের গুলিতে সেদিন ছয়জন নিহত হন। তারা হলেন শহীদ শাহরিয়ার খান আনাস, শহীদ শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, শহীদ মোহাম্মদ ইয়াকুব, শহীদ মো. রাকিব হাওলাদার, শহীদ মো. ইসমামুল হক ও শহীদ মানিক মিয়া।
