সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছে নতুন এক বিউটি ট্রেন্ড। যার নাম ল্যাটে মেকআপ। যেখানে চোখ, ঠোঁট ও গালের প্রতিটি রঙেই ফুটে উঠছে কফির নানা শেড। ক্যারামেল, কোকো, ব্রোঞ্জ আর নুড টোনের মিলনে
তৈরি এই লুক এখন রীতিমতো বৈশ্বিক ট্রেন্ড। বিশেষ করে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন একের পর এক ল্যাটে লুক শেয়ার করছেন, তখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও বাড়ছে কৌতূহল।
বাংলাদেশের মেকআপপ্রেমীদের কাছেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই মেকআপ স্টাইল। ল্যাটে মেকআপের আদ্যোপান্ত জানালেন জান্নাত আক্তার নিপু
ল্যাটে মেকআপ হচ্ছে এমন এক স্টাইল যেখানে পুরো মুখে ব্যবহৃত হয় কফির বিভিন্ন শেড কখনো দুধে কফির মতো হালকা, কখনো গাঢ় এসপ্রেসোর মতো গভীর। এই মেকআপে নেই উজ্জ্বল গোলাপি বা ঝলমলে গ্লিটার। বরং, পুরো লুক জুড়ে থাকে ক্যারামেল-ব্রাউন টোনের ওয়ার্ম অথচ সফট এক সৌন্দর্য।
কীভাবে করবেন ল্যাটে মেকআপ
ল্যাটে মেকআপ করার পদ্ধতি খুবই সহজ এবং সময়সাশ্রয়ী, নিচে ধাপে ধাপে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো। যা অনুসরণ করলে আপনি ঘরে বসেই তৈরি করতে পারেন ল্যাটে মেকআপ লুক।
ধাপ ১ : স্কিন প্রস্তুত
ল্যাটে মেকআপ করতে প্রথমেই প্রয়োজন ত্বককে প্রস্তুত করা। পরিষ্কার ও ময়েশ্চারাইজড ত্বকে মেকআপ যেমন ভালো বসে, তেমনি গ্লোয়িং বেস তৈরি করতেও সহায়তা করে।
ধাপ ২ : বেস মেকআপ
স্কিন ভালোভাবে প্রস্তুত করার পর হালকা কভারেজের ডিউই ফাউন্ডেশন কিংবা বিবি ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। যেহেতু ল্যাটে মেকআপের মূল সৌন্দর্য তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যে, তাই ভারী বেস এড়িয়ে যাওয়া উচিত। চোখের নিচে বা প্রয়োজনীয় স্থানে হালকা কনসিলার ব্যবহার করে দাগ বা ক্লান্তির ছাপ ঢেকে নেওয়া যেতে পারে।
ধাপ ৩ : ব্রোঞ্জার ও কনট্যুর
বেস মেকআপের পর চেহারায় উষ্ণতা যোগ করতে মুখের বিভিন্ন অংশে ব্রোঞ্জার ব্যবহার করতে হয়। গালের হাড়, কপালের প্রান্ত এবং থুতনির নিচে হালকা করে ব্রোঞ্জার ব্লেন্ড করলে মুখে সূর্যালোকের মতো এক কোমল উষ্ণ আভা তৈরি হয়। এটি পুরো ল্যাটে লুকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ধাপ ৪ : আই মেকআপ
চোখের মেকআপেও থাকে সেই একই ওয়ার্ম টোন। চোখের ভাঁজে হালকা ব্রাউন বা ক্যারামেল রঙের আইশ্যাডো ব্লেন্ড করা হয়, যা চোখকে দেয় সফট লুক। চাইলে নিচের ল্যাশলাইনেও সামান্য শেড লাগিয়ে দিতে পারেন। আইলাইনার ব্যবহার না করলেও চলে, তবে হালকা করে মাসকারা লাগিয়ে চোখকে খানিকটা সংজ্ঞায়িত করা যায়।
ধাপ ৫ : ব্লাশ
গালের জন্য বেছে নেওয়া হয় পিচ, টেরাকোটা বা কফির শেডঘেঁষা ব্লাশ। এটি গালের উঁচু অংশে হালকা করে লাগিয়ে ব্লেন্ড করা হয়, যাতে মেকআপ আরও বেশি প্রাকৃতিক দেখায়। হাইলাইটার প্রয়োগ ঐচ্ছিক হলেও, কেউ কেউ নাকের ডগা, গালের হাড় ও কপালের মাঝখানে হালকা হাইলাইট দেন তবে সেটি যেন কখনোই অতিরিক্ত না হয়।
ধাপ ৬ : হাইলাইটার
হাইলাইটার প্রয়োগ ঐচ্ছিক হলেও, কেউ কেউ নাকের ডগা, গালের হাড় ও কপালের মাঝখানে হালকা হাইলাইট দেন। তবে সেটি যেন কখনোই অতিরিক্ত না হয়।
ধাপ ৭ : লিপস
নিউড ব্রাউন, টোস্টেড কফি বা চকোলেট শেডের লিপস্টিক ব্যবহার করুন। লিপলাইনার দিয়ে ঠোঁট একটু শেপ করে নিয়ে ক্রিমি বা ম্যাট ফিনিশ লিপস্টিক ব্যবহার করুন।
কোথায় থেকে এলো এই কফি-মাখানো ট্রেন্ড
ইনফ্লুয়েন্সার জধপযবষ জরমষবৎ প্রথম ল্যাটে মেকআপ টার্মটি ব্যবহার করেন এবং পরে ঐধরষবু ইরবনবৎ-এর মতো স্টাইল আইকনরা এটি জনপ্রিয় করে তোলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রেন্ডটি ছড়িয়ে পড়ে ইনস্টাগ্রাম রিল, পিন্টারেস্ট এবং ইউটিউব টিউটোরিয়ালে।
কেন গরমের জন্য সেরা
গরমকালে মেকআপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘাম, অতিরিক্ত তেল এবং আর্দ্রতার কারণে মেকআপ গলে যাওয়া। ল্যাটে মেকআপ এই সমস্যার এক চমৎকার সমাধান।
হালকা বেইজ : ল্যাটে মেকআপে ভারী ফাউন্ডেশন ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। বরং বিবি বা সিসি ক্রিম অথবা শুধু হালকা কভারেজের টিন্টেড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা হয়। যা ত্বকে স্বস্তি দেয়। ত্বককে শ্বাস নিতে সাহায্য করে, ফলে গরমকালে মেকআপ গলে যাওয়ার প্রবণতা কমে যায়।
উষ্ণ রঙের ব্যবহার
এই মেকআপে ব্যবহৃত উষ্ণ বাদামি এবং ব্রোঞ্জ শেডগুলো আমাদের ত্বকের স্বাভাবিক রঙের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যায়। কৃত্রিম বা চটকদার রঙের ব্যবহার না থাকায়, মেকআপ গলে গেলেও তা ততটা চোখে পড়ে না, যা দিনের বেলা বা প্রখর রোদে সতেজ থাকার অনুভূতি দেয়।
কনট্যুরিংয়ের বদলে ব্রোঞ্জিং
এই লুকে কনট্যুরিংয়ের বদলে ব্রোঞ্জার ব্যবহার করা হয়। ব্রোঞ্জার আমাদের ত্বককে উষ্ণতা দেয় এবং একটি প্রাকৃতিক শেপ তৈরি করে। এটি ক্রিম এবং পাউডার দুই ফরম্যাটেই ব্যবহার করা যায়। গ্রীষ্মকালে পাউডার ব্রোঞ্জার বেশি উপযোগী, কারণ এটি তেল ও ঘাম নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং মেকআপকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
ল্যাটে মেকআপ কারা করতে পারেন
ল্যাটে মেকআপ এমন এক স্টাইল, যা মূলত সবাই করতে পারেন। এটি ন্যাচারাল এবং হালকা ব্রাউন টোনের মেকআপ হওয়ায়, যেকোনো ত্বকের রঙের জন্য মানানসই। যারা ভারী বা গ্ল্যামারাস মেকআপ পছন্দ করেন না, তাদের জন্য এটি একটি পারফেক্ট অপশন। বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র পরিবেশে এই মেকআপ লুক দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং টাচআপের প্রয়োজন কম হয়। তাই যারা অফিস, কলেজ কিংবা দৈনন্দিন জীবনে সহজ মেকআপ চান, তারা সহজেই ল্যাটে মেকআপ করতে পারেন। এছাড়া ইভেন্ট বা পার্টিতে গ্ল্যামারস লুক না চাইলেও সাবলীল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রকাশ করতে যারা চান, তাদের জন্যও ল্যাটে মেকআপ খুব ভালো বিকল্প। তবে যদি কারও ত্বকে প্রচ- লালচে বা ব্রণ থাকে, তবে একটু সাবধানতা প্রয়োজন, কারণ এই ব্রাউন শেড সবসময় এই সমস্যাগুলো ঢাকা দিতে পারে না। আর যারা উজ্জ্বল বা রঙিন মেকআপ পছন্দ করেন, তাদের জন্য হয়তো ল্যাটে মেকআপ একটু সাদাসিধে লাগতে পারে।
মেকআপকে টেকসই করার বিশেষ টিপস
গরমের দিনে মেকআপ ধরে রাখতে হলে কিছু কৌশল মানা জরুরি।
লেয়ারিং নয়, ব্লেন্ডিং : মেকআপের প্রতিটি প্রোডাক্ট হালকা হাতে ব্যবহার করুন এবং নিখুঁতভাবে ব্লেন্ড করুন। ঘন ঘন লেয়ারিং করলে মেকআপ ভারী হয়ে যায় এবং ঘামে গলে যাওয়ার সুযোগ বাড়ে।
সেটিং স্প্রে : মেকআপ শেষ করার পর অবশ্যই ভালো মানের ম্যাটিফাইং সেটিং স্প্রে ব্যবহার করুন। এটি মেকআপকে লক করে দেয় এবং ঘাম-সহ আর্দ্রতার প্রভাব কমায়।
ব্লোটিং পেপার : দিনের বেলায় ত্বক অতিরিক্ত তেলতেলে মনে হলে মেকআপের ওপর টিস্যু বা পাউডার ব্যবহার না করে, ব্লটিং পেপার দিয়ে আলতো করে তেল শুষে নিন।
ল্যাটে মেকআপ গ্রীষ্মকালীন বিউটি ট্রেন্ডে এক দারুণ সংযোজন, যা ফ্যাশন সচেতন নারীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এই মেকআপ লুকটি একই সঙ্গে আধুনিক, মার্জিত এবং টেকসই, যা গ্রীষ্মের উষ্ণতায় আপনাকে এনে দেবে এক স্নিগ্ধ, কফি-রঙা উষ্ণ আভা।
