জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে ৪১টি জেলার ৪৩৮টি স্পটে হত্যাকান্ড চালানো হয়। আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয় ৫০টি জেলায়। অভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকান্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মামলায় বিচারের সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানিতে গতকাল সোমবার এসব তথ্য তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি বই থেকে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন।
শুনানিতে তিনি আরও বলেন, গত বছরের ১৭ জুলাই আন্দোলন দমনে লেথাল উইপন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ১৮ জুলাই থেকে হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে গুলি করা শুরু হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ প্রসিকিউশন গতকাল দ্বিতীয় কার্যদিবসে যুক্তিতর্কের শুনানি উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। আদালত আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি করেন। প্রসিকিউশনের শুনানি শেষে যুক্তিতর্কের শুনানি করবেন শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন।
এর আগে গত বুধবার এ মামলায় ৫৪তম ও সবশেষ সাক্ষী তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আলমগীরকে জেরার মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য শেষ হয়। অন্য আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এ মামলায় রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। গতকাল শুনানিকালে তাকে ট্রাইব্যুনালের ডকে হাজির করা হয়। গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম অভ্যুত্থান চলাকালে ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত আন্দোলন ও হত্যাকান্ডের প্রতিবেদন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৮ জুলাই থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয় করে ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। এর আগে ১৭ জুলাই শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লেথাল উইপন ব্যবহার করে গুলির নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। শুনানিতে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় দেশব্যাপী সবচেয়ে বেশি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে ১৮ ও ১৯ জুলাই। এর মধ্যে ১৮ জুলাই শুধু ঢাকার রামপুরা এলাকাতে ২৮ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া বাড্ডা, শনির আখড়া, উত্তরা, যাত্রাবাড়িসহ ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় ব্যাপক হত্যাকান্ড চালানো হয়। গণঅভ্যুত্থানে নিয়ে একটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ৪১ জেলার ৪৩৮ স্পটে হত্যাকান্ড চালানো হয়। এ ছাড়া ৫০টি জেলায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়ে হত্যাকান্ড চালানো হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বেশকিছু গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক এসব হত্যাকান্ড ঘটানো হয়।
গুলিবিদ্ধ হৃদয়ের লাশ ফেলা হয় কড্ডা নদীতে : শুনানিকালে একটি প্রামাণ্য ভিডিও প্রদর্শন করা হয় ট্রাইব্যুনালে। যেখানে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কলেজ শিক্ষার্থী ও অটো রিকশাচালক হৃদয়কে পুুলিশ কর্তৃক সরাসরি গুলি করে হত্যার দৃশ্য দেখা যায়। প্রামাণ্যচিত্রের ধারা বিবরণী অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের পর বিকেলের দিকে ওই এলাকায় নিরীহ ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে গুলি করে পুলিশ। কোনাবাড়ী এলাকায় একটি গলিতে হৃদয়কে কয়েকজন পুলিশ ঘিরে ফেলে। একজন পুলিশ সদস্য তাকে মারতে উদ্যত হন। একপর্যায়ে একজন পুলিশ তার শরীরে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করলে হৃদয় সড়কে লুটিয়ে পড়েন। পরে কয়েক পুলিশ সদস্যকে হৃদয়ের নিথর দেহ চ্যাংদোলা করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিও চিত্র প্রদর্শনের পর চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, হৃদয়ের লাশ স্থানীয় কড্ডা নদীতে ফেলে দেয় পুলিশ। এ বিষয়ে হৃদয় হত্যা মামলার একজন আসামি (পুলিশ সদস্য) স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হৃদয়কে কড্ডা নদীর ওপর একটি ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে ডুবুরির মাধ্যমে চেষ্টা করা হলেও লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
