বঙ্গবাজার পোড়ানোর মামলার এক আসামিকে সংবর্ধনা দিয়েছে মার্কেটেরই একদল ব্যবসায়ী; অথচ পুলিশ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। গত ৪ অক্টোবর মার্কেট পোড়ানোর মামলার এজহারভুক্ত আসামি জহিরুল ইসলামকে এনেক্সো টাওয়ারে নিয়ে যায় কিছু ব্যবসায়ী। মামলার ৬ নম্বর আসামি তিনি।
২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে আগুনে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের চারটি মার্কেট সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। পোড়ে আশপাশের আরও তিনটি মার্কেট। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি বহুতল ভবনও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বলা হয়েছিল, বিড়ি বা কয়েল থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনেও এমন কারণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আগুন লাগার দিন থেকেই ব্যবসায়ীরা বলছিলেন, ঘটনাটি পরিকল্পিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ২২ অক্টোবর বঙ্গবাজারে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার অভিযোগ এনে শাহবাগ থানায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা কামাল হোসেন রিপন। পরদিন মামলা দায়েরে বিলম্বের কারণ উল্লেখসহ আদালতে প্রতিবেদন পাঠায় পুলিশ। পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবাজারে আগুন লাগানো হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এরপর আত্মগোপনে চলে যান জহিরুল ইসলাম। তাকে আর প্রকাশ্যে মার্কেট পাড়ায় দেখা যায়নি। বঙ্গবাজারে অগ্নিকান্ডের সময় তিনি মার্কেটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। পোড়া মার্কেটে এক সংবাদ সম্মেলনে এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে মারধর করেন তিনি। মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তৎকালীন মেয়র তাপস ও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের এমপি আফজালের আস্থাভাজন হওয়ায় মারধরের ঘটনায় বিচার হয়নি তার।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় মার্কেটে ফিরেছেন জহিরুল ইসলাম। তাদের ম্যানেজ করার কারণে মামলা থাকলেও তার কোনো সমস্যা হবে না এমন আশ্বাস পেয়েছেন তিনি। এক বছরের বেশি সময় পর মার্কেটে ঢুকলে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
এনেক্সো টাওয়ারে জহিরুল ইসলামকে সংবর্ধনা দেওয়ার একটি সিসি টিভি ফুটেজ দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। গত ৪ অক্টোবরের সেই ফুটেজে দেখা গেছে বেলা ১১টা ১৩ মিনিটে এনেক্সো টাওয়ারে যান আসামি জহিরুল ইসলাম। মার্কেটে ঢুকতেই তাকে জানানো হয় ফুলেল শুভেচ্ছা। এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে জহিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দিলে নম্বরটি পরপর তিন দিন বন্ধ পাওয়া যায়।
জানা গেছে, বঙ্গবাজার পোড়ানোর মামলায় মার্কেটের সহসভাপতি নাজমুল হাসান, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন এবং যুবলীগ নেতা শাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাজমুল এবং শাহবুদ্দিন জামিনে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। সাবেক এমপি আফজাল কারাগারে আছেন। সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, সাবেক কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতনসহ বাকি আসামিরা পলাতক।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু জহির নয়, তৎকালীন মেয়র-এমপি-কাউন্সিলর সিন্ডিকেটের অনেক আসামি প্রকাশ্যেই ব্যবসায় করছেন। তাদের শেল্টার দিচ্ছে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারীর (পিএস) আশ্বাসে জহিরসহ অভিযুক্ত প্রায় সবাই মার্কেটে এসেছেন বলেও অভিযোগ তাদের।
জানতে চাইলে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই মাইনুল ইসলাম খান পুলক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের খুঁজে পেলে ধরা হবে।’ মার্কেটে আসামিদের ঘোরাফেরা ও সংবর্ধনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমন হওয়ার কথা নয়, বিষয়টি জানা নেই। তদন্ত চলমান। তদন্ত শেষ হলে চার্জশিট দেওয়া হবে।’
সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধে মামলা হলে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে। আসামিদের উচিত জামিন নেওয়া। জামিন ছাড়া প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলে পুলিশের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের গ্রেপ্তার করা।’
