হাসিনার ফাঁসি চাইল প্রসিকিউশন

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৪০ এএম

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকান্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরম দ- (মৃত্যুদ-) চেয়েছে প্রসিকিউশন। একই সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালেরও একই সাজার আরজি জানিয়েছে প্রসিকিউশন। গতকাল বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে এমন আরজি জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

শুনানিতে তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। একেকটি অভিযোগে তার ১৪০০ বার ফাঁসি হওয়া উচিত। তবে সেটি যেহেতু সম্ভব নয়, তাই একবারের জন্য হলেও তাকে চরম দ- দেওয়া উচিত।’ শুনানিতে তিনি এ মামলার রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আমরা মনে করি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ঘটনার সত্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য তুলে ধরেছেন। এখন তার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালই বিবেচনা করবে।’ বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল আগামী সোমবার আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য দিন ধার্য করে। ওইদিন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন শুনানি করবেন। এরপর প্রসিকিউশন আসামিপক্ষের যুক্তি খ-ন করবে। এর আগে গত ৮ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত রবিবার যুক্তিতর্কের শুনানি শুরু করে প্রসিকিউশনপক্ষ।

গতকাল বিচারিক কার্যক্রমের শুরুতে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম এ মামলায় তৃতীয় অভিযোগের ওপর যুক্তিতর্কের শুনানি তুলে ধরেন। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় এ অভিযোগটি আনা হয়েছে। এ-সংক্রান্তে শুনানির পর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র অভিযোগের ওপর শুনানি করেন। এ সময় তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর কয়েকটি ধারা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি ‘রোম স্ট্যাটিউট’র অনুচ্ছেদ ২৮ তুলে ধরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ কীভাবে প্রমাণিত হয়েছে তার ব্যাখা দেন।

নিরস্ত্র জনগণের ওপর আক্রমণে নলেজ অব কমিটিং অ্যাটাক (ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জ্ঞাত থাকা) বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর শুনানিতে বলেন, ‘ফজলে নূর তাপস (ডিএসসিসির সাবেক মেয়র), হাসানুল হক ইনু (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি), মাকসুদ কামালের (ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি) সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন থেকে এটা পরিষ্কার প্রমাণিত হয়েছে যে, সব হামলার ব্যাপারে তিনি (শেখ হাসিনা) সম্পূর্ণভাবে ফুললি অ্যাওয়ার (জ্ঞাত থাকা) ছিলেন এবং তিনি নিজে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন।’

তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিষয়ে শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ ‘কমান্ড’ তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে। তিনি ছিলেন হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী। যারা অস্ত্র ব্যবহার করেছিল তাদের সঙ্গে তার ‘সুপিরিয়র সাবোর্ডিনেট রিলেশন’ ছিল। আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় ‘কোর কমিটি’র নিয়মিত বৈঠক হতো। তিনি আইজিপিকে (চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন) যাবতীয় নির্দেশ দিয়েছিলেন। আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার পথে যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তার ভিডিও দেখেছেন তিনি, যেখান ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে (আসাদুজ্জামান খান কামাল) বলেন, ‘স্যার গুলি করি একটা, একটাই যায়, বাকিডি যায় না স্যার।’ চিফ প্রসিকিউটর বলেন, অধস্তনদের এমন কর্মকান্ডের পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। নেননি এ কারণে যে নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন।

চিফ প্রসিকিউটর ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির’ ওপর আন্তর্জাতিক আদালতের কয়েকটি রায় ও সিদ্ধান্ত পড়ে শোনান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি একজন জেনারেলের যুদ্ধাপরাধের মামলাসহ তিনটি মামলার অংশ বিশেষ পড়ে শোনান তিনি। তাজুল ইসলাম বলেন, ওইসব মামলায় যেভাবে ‘ওয়াইডস্প্রেড’ এবং ‘সিস্টেম্যাটিক অ্যাটাক’ প্রমাণ হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে এখানে এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর শুনানিতে বলেন, ‘হত্যাকান্ড সংঘটিত করতে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রে পুরো ফোর্সকে ব্যবহার করেছেন। বিজিবি, পুলিশ, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করেছেন। শুধু সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে পারেননি। আন্দোলনের শেষদিকে সেনাবাহিনী নির্বিচার হত্যাকান্ডে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। না হলে আরও অজস্র প্রাণ ঝরে যেত।’ তিনি বলেন, ‘শুধু কোটা আন্দোলন দমন এ হত্যাকান্ডের উদ্দেশ্য ছিল না। এ নৃশংসতার উদ্দেশ্য ছিল, শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় রাখা।’

শেখ হাসিনার চরম দ-ের আরজি জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে বলেন, “এসব মানবতাবিরোধী কাজে তার চরম জিঘাংসা ফুটে উঠেছে। তিনি জানতেন যে এসব হত্যাকান্ড ঘটবে। কেননা তিনি নিজেই নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ছিলেন এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের ‘নিউক্লিয়াস’ ও ‘প্রাণভোমরা’। এই নিউক্লিয়াস ভেঙে দিতে হবে।” তিনি বলেন, ‘তার (শেখ হাসিনা) অপরাধ সর্বোচ্চ পর্যায়ের। এতকিছুর পরেও তার মধ্যে সামান্যতম অনুশোচনা নেই।’ প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘১৪০০ মানুষ হত্যায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনা। একজনের জন্য একবার মৃত্যুদ- হলে তার ১৪০০ বার ফাঁসি হওয়া উচিত। তবে সেটি যেহেতু সম্ভব নয় তাই একবারের জন্য ফাঁসি দেওয়া না হলে সেটি হবে ভুক্তভোগীদের প্রতি অবিচার। বাংলাদেশের মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়া হবে যদি চরম দ-টা দেওয়া হয়।’ পাশাপাশি আসাদুজ্জামান খান কামালেরও চরম দ-ের আবেদন জানান অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। রাজসাক্ষী চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি সাক্ষ্যতে তিনি ঘটনা সম্পর্কে সত্য ও পুরোপুরি তথ্য প্রকাশ করেছেন। এখন তার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালই সিদ্ধান্ত নেবেন। নিহত আন্দোলনকারীদের পরিবার ও আহতদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণেরও আরজি জানান তিনি।

আসিফ মাহমুদের সাক্ষ্য শেষ : গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন এ মামলার আসামিপক্ষের তিন আইনজীবী। এর আগে গত ৯ অক্টোবর তিনি আংশিক জবানবন্দি দেন। গতকাল অসমাপ্ত জবানবন্দি শেষ করেন তিনি। চানখাঁরপুল হত্যাকান্ডের এ মামলায় গত ১৪ জুলাই অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে। চানখাঁরপুলে গত বছরের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত