নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:২৬ এএম

এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিনটি বড় অগ্নিকা- হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুনের ঘটনায় ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের। সরকারের হাইকমান্ড থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশ তোড়জোড় শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন, পুলিশের সব কটি ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গভীরে গিয়ে তদন্ত শুরু করছে। তারা ক্ষতিয়ে দেখছে ঘটনাগুলো নাশকতা, নাকি দুর্ঘটনা।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ড বেড়ে চলেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, বাজার, এমনকি আবাসিক ভবনেও আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নিচ্ছে মূল্যবান জীবন ও সম্পদ। এসব ঘটনার পর বারবারই প্রশ্ন উঠছে, এগুলো নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো নাশকতার ইন্ধন? ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ দুর্ঘটনাজনিত হলেও এর ভয়াবহতা এবং ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর মিরপুরের পোশাক কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ (সিপিইজেড) আদম ক্যাপ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা, টঙ্গীতে কেমিক্যাল গুদাম ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার ঘটনাটি সরকারের শীর্ষ মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ নিয়ে সরকারের ভেতরেই এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে। অতীতে চুড়িহাট্টা, নিমতলী ও বেইলি রোডের মতো ট্র্যাজেডিগুলো প্রমাণ করেছে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এসব ঘটনায় একদিকে যেমন ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে, তেমনি হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগুনের ঘটনাগুলো আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হচ্ছে। বিমানবন্দরের আগুনের ঘটনাটি বেশি সন্দেহ করা হচ্ছে। ঘটনাগুলোর মূল রহস্য উদঘাটন করতে পুলিশের সব কটি ইউনিট তদন্ত করছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থাও তদন্ত করছে।’

ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্র জানায়, দুটি সংস্থার একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৩৭ শতাংশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। অপরিকল্পিত ও অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিম্নমানের তার ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের প্রধান কারণ। তা ছাড়া গ্যাসের চুলা বা অন্য কোনো ধরনের চুলা থেকে সৃষ্ট আগুন দুর্ঘটনার দ্বিতীয় প্রধান কারণ। প্রায় ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ আগুন লাগছে এ কারণে। চুলা পুরোপুরি বন্ধ না করা বা রান্নার পর অসাবধানতার জন্য দায়ী। পুরান ঢাকা, মিরপুর বা অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আবাসিক ভবনের পাশে বা নিচে কেমিক্যাল ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থের অবৈধ গুদাম স্থাপন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ও ভয়াবহতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘনবসতি, সরু রাস্তা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মেনে ভবন নির্মাণ (জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব) আগুন লাগার পর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিড়ি-সিগারেটের জ¦লন্ত টুকরো বা অন্যান্য সাধারণ অসতর্কতাও অনেক অগ্নিকাণ্ডের জন্ম দিচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নাশকতার বিষয়টিও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে থাকতে পারে।

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েকটি বড় অগ্নিকা-ের ধরন দেখে আমাদের মনে হচ্ছে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে। আজ (গতকাল) বিমানবন্দরের ঘটনাটি বেশি সন্দেহ করা হচ্ছে। সরকারের হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা এসেছে জোরালোভাবে তদন্ত করতে। আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। আগুন লাগার ঘটনাস্থল ও আশপাশের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে অনেক অগ্নিকান্ড আমরা নিছক দুর্ঘটনা হিসেবেই ধরে নিয়েছি। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো প্রতিবেদনই প্রকাশ্যে আসে না। আমাদের তথ্যমতে, অনেক ঘটনা নাশকতার আলামত আছে। সরকার বেকায়দায় পড়বে বলে এসব প্রকাশ করা হয় না। এসব বিষয় নিয়ে ঊর্ধ্বতনদের অবহিত করা হবে।’

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁয় অগ্নিদুর্ঘটনা ছাড়া ঢাকা শহরের রাসায়নিক গুদাম ও কারখানায় বেশ কয়েকবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় মজুদ করা রাসায়নিক পদার্থের বিস্ফোরণে আগুন লেগে পুড়ে অঙ্গার হয় ৭৯টি তরতাজা প্রাণ। গুরুতর আহত হয় ৪১ জন। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে সংঘটিত স্মরণকালের ভয়াবহ মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নেয় ১২৫ জনের প্রাণ। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক গুদামে দাহ্য পদার্থ মজুদের পরিণতি যে কত ভয়ংকর হতে পারে, নিমতলী ট্র্যাজেডির ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড জ্বলন্ত প্রমাণ। একসময় গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। গাজীপুরের কাশিমপুরের একটি পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে ৫০ জন, আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ আগুন লেগে ১২৪, নরসিংহপুরে হামীম গ্রুপের একটি অত্যাধুনিক বহুতল পোশাকশিল্প কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২৬, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তাসংলগ্ন ভোগড়া শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত গরীব অ্যান্ড গরীব সোয়েটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২১, মহাখালীর একটি নিটিং কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১২ এবং নরসিংদীর একটি তোয়ালে কারখানার আগুন লেগে ৪৬ জন মারা যায়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২৭ হাজার ৬২৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এই ঘটনাগুলোয় ৭৯২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষতি হয় এবং ১০২ জন নিহত হয়। ২০২৪ সালে সারা দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব আগুনে প্রাণ হারিয়েছে ১৪০ জন, আহত হয়েছে আরও ৩৪১ জন। ২০২৫ সালে প্রথম ৭ মাসে ১৫৪ জন আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনায় মারা গেছে। প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হলেও প্রকাশ্যে আসেনি কোনো প্রতিবেদন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বড় বড় অগ্নিকাণ্ডগুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা গভীরে গিয়ে তদন্ত করছি এবং আগ থেকেই বলে এসেছি আমাদের সুপারিশ ছিল বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে আবাসিক এলাকায় কোনো ধরনের রাসায়নিকের দোকান বা গুদাম স্থাপন করা যাবে না। এসব সুপারিশ ও ফায়ার সার্ভিসের পরিকল্পনাগুলো কেউ তেমন আমলে নেয়নি। আজ যদি এসব বাস্তবায়িত হতো বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতো, তাহলে কেমিক্যালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মানুষকে মরতে হতো না। নিজের মতো সবকিছু গড়ি এবং আইন না মেনে তা বছরের পর বছর চলছে। যার কারণে ঘটছে এসব বড় দুর্ঘটনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইনের কঠোর এবং নিয়মিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও যেসব ভবন বা স্থাপনায় কার্যক্রম চলে, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আবাসিক এলাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থান থেকে সব ধরনের অবৈধ কেমিক্যাল এবং দাহ্য পদার্থের গুদাম অবিলম্বে অপসারণ করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার এবং সংযোগগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন ও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত