হাদিসে বর্ণিত তিন ব্যক্তির পরীক্ষা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৪৭ এএম

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, বনি ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই তিনি তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেতরোগীটির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কাছে কোন জিনিস বেশি প্রিয়? সে জবাব দিল, সুন্দর রঙ ও সুন্দর চামড়া। কেননা মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরের ওপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রঙ এবং সুন্দর চামড়া দান করা হলো। তারপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন ধরনের সম্পদ তোমার কাছে বেশি প্রিয়? সে জবাব দিল উট। অতঃপর তাকে তা দিয়ে ফেরেশতা বললেন, এতে তোমার জন্য বরকত হোক।

এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গেলেন এবং বললেন, তোমার কাছে কি জিনিস পছন্দনীয়? সে বলল, সুন্দর চুল এবং আমার থেকে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে (তার মাথায়) সুন্দর চুল দেওয়া হলো। ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করলেন, কোন সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল গরু। তারপর তাকে তা দিয়ে ফেরেশতা বললেন, এতে তোমাকে বরকত হোক।

এরপর ফেরেশতা অন্ধের নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন জিনিস তোমার কাছে বেশি প্রিয়? সে বলল, আল্লাহ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি। তখন ফেরেশতা তার চোখের ওপর হাত বুলিয়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করলেন, কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল ছাগল। তখন তিনি তা দিয়ে বললেন, এতে তোমার জন্য বরকত হোক।

ওপরে উল্লিখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং অপজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল।

এরপর ওই ফেরেশতা তার পূর্ববর্তী আকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর কাছে এসে বললেন, আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। আমার সফরের সব সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্যে পৌঁছার কোনো উপায় নেই আল্লাহ ছাড়া। আমি তোমার কাছে ওই সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রঙ, কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর ওপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছাব। তখন লোকটি তাকে বলল, আমার ওপর অনেক দায়দায়িত্ব রয়েছে। (কাজেই আমার পক্ষে দান করা সম্ভব নয়) তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি এক সময় শ্বেতরোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত। তুমি কি ফকির ছিলে না? এরপর আল্লাহ তোমাকে (প্রচুর সম্পদ) দান করেছেন। তখন সে বলল, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ থেকে ওয়ারিশসূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে সেরূপ করে দিন, যেমন তুমি ছিলে।

তারপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে গেলেন এবং তাকে ঠিক তদ্রুপই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেতরোগীকে বলেছিলেন। সেও তাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল যেমন জবাব দিয়েছিল শ্বেতরোগী। তখন ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমার তেমন অবস্থা করে দিন, যেমন তুমি ছিলে।

শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির কাছে আসলেন, তার কাছেও একইভাবে বললেন। সে বলল, আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকির ছিলাম। আল্লাহ আমাকে ধনী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম, আল্লাহর ওয়াস্তে তুমি যা কিছু নেবে, তার জন্য আজ আমি তোমার নিকট কোনো প্রশংসাই দাবি করব না। তখন ফেরেশতা বললেন, তোমার মাল তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিনজনকে পরীক্ষা করা হলো মাত্র। আল্লাহ তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তোমার সাথি দুজনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। (সহিহ বুখারি ৩৪৬৪) এ হাদিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা ও উপদেশ পাওয়া যায়।

নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করা : আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার পর শোকরিয়া আদায় করতে হয়। এতে নেয়ামত বৃদ্ধি পায়। কৃতজ্ঞ হওয়া শুধু মুখের কথা নয়, কাজের মাধ্যমেও প্রকাশ করতে হয়। তৃতীয় ব্যক্তি অন্ধত্ব থেকে মুক্তি পেয়েও নিজের অতীত ভুলে যাননি। তাই তিনি আন্তরিকভাবে সাহায্য করলেন। এটি প্রকৃত কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

কৃপণতা অকৃতজ্ঞ করে তোলে : কৃপণতা কঠিন আত্মিক ব্যাধি। এর ফলে মানুষ অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে। আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করে। প্রথম দুই ব্যক্তি কৃপণতার কারণে দান করা থেকে বিরত ছিল। তারা নিজেদের দায়িত্বের অজুহাত দেখিয়ে ফেরেশতাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। ফলে আল্লাহর অনুগ্রহ হারিয়ে তারা আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

লেখক : খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত