ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চত্বরে অগ্নিকা-ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পুড়ে যাওয়ার দাবি করা হলেও এর কোনো সত্যতা মেলেনি। রূপপুর প্রকল্পের কর্মকর্তারা ও রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কিছু জানে না। এমনকি যে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে ওই দাবি করা হয়েছে তারা জানিয়েছে, রূপপুর প্রকল্পে তারা কাজ করে না।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর হওয়ায় এ প্রকল্পের মালামাল পুড়ে যাওয়ার খবরটি গতকাল দিনভর আলোচনায় ছিল। এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার সত্যতা খুঁজে পায়নি দেশ রূপান্তর। তাহলে কেন এমন প্রচার- প্রচারণা সেই বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
শনিবার দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্স ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে। ওই কমপ্লেক্সে আকাশপথে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা পণ্য রাখার গুদাম রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিজিবির প্রচেষ্টায় সাত ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও সেখানে থাকা বহু মূল্যমান মালামাল পুড়ে যায়। এ সবের মধ্যে রাশিয়া থেকে আনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ছিল বলে সিঅ্যান্ডএফ মমতা ট্রেডিং কোম্পানির কথিত কর্মকর্তা সরকার বিপ্লব হোসাইন সাংবাদিকদের বলেছিলেন।
মমতা ট্রেডিং মূলত আমদানিকৃত পণ্য খালাসের কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট থেকে ফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করা হলে আশরাফুল আলম নামের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা রূপপুর প্রকল্পের কোনো কাজে সংশ্লিষ্ট নই। বিপ্লব হোসাইন নামে কেউ আমাদের এখানে কাজ করেন না।’
বিমানবন্দর এলাকায় বিপ্লব হোসাইন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘রূপপুর প্রকল্পের জন্য রাশিয়া থেকে সাতটি শিপমেন্টের মাধ্যমে প্রায় ১৮ টনের মতো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আনা হয়েছিল ৬ দিন আগে। এসব পণ্য খালাসের জন্য পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে এনওসি (অনাপত্তিপত্র) নিতে হয়। এনওসি নিতে দেরি হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পণ্য খালাস করা যায়নি। রবিবার খালাস হওয়ার কথা ছিল।’
এ বিষয়ে জানতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক মো. কবির হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির ৪ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তারা জানান, রূপপুর প্রকল্পের বেশিরভাগ মালামাল জাহাজযোগে সমুদ্রপথে আসে। কিছু মালামাল আসে বিমানে। এগুলোর আমদানি ও স্থাপনের দায়িত্ব রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। যেভাবেই মালামাল আমদানি করা হোক না কেন তা প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর পর যখন হস্তান্তর করা হয়, তখনই কেবল এর দায়দায়িত্ব প্রকল্পের ওপর পড়ে; তার আগে নয়। প্রায়ই বিভিন্নভাবে মালামাল আমদানি করা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনা শোনার পর আমরা রাশিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারাও বিষয়টি জানেন না বলে জানিয়েছেন। মমতা ট্রেডিং নামের কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের কাজ রাশিয়ানরা দেননি বলে আমরা জেনেছি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।’
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, রাশিয়ার মূল ঠিকাদার কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সেই সাব-কন্ট্রাক্টরদের কেউ কেউ আবার তাদের জন্য সাব-কন্টাক্ট্রর নিয়োগ দেয়। ফলে অনেক কিছুই প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বা রাশিয়ানদের জানা থাকে না। কিন্তু ১৮ টনের মতো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যদি রাশিয়া থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে তাহলে সে বিষয়ে রাশিয়ানদের জানার কথা। আবার প্রশ্ন উঠেছে, রাশিয়া থেকে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি আমদানি করার জন্য রাশিয়ান প্রতিষ্ঠান কেন আরেক প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেবে? এ রহস্য উদঘাটন করা দরকার। এ বিষয়ে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রসঙ্গত, রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট মিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রসাটম। দুই দফা সময়সীমা পিছিয়ে চলতি বছরে প্রথম ইউনিট এবং আগামী বছরে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কাজের অগ্রগতি বলছে, আগামী বছর প্রথম ইউনিট ও পরের বছর উৎপাদনে আসবে দ্বিতীয় ইউনিট।
