শুনানিতে আইনজীবী

শেখ হাসিনাকে অপসারণ ছিল ‘ডিজাইন’র অংশ

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৪৬ এএম

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন বলেছেন, শেখ হাসিনাকে অপসারণ করা ছিল ‘ডিজাইন’র অংশ। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোনো দুঃশাসন ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ যুক্তিতর্কের শুনানিকালে এসব কথা বলেন তিনি। আদালত আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে। গত বৃহস্পতিবার এ মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয়। প্রসিকিউশন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের চরম দ-ের (ফাঁস) আরজি জানায়। গতকাল শুনানিতে আইনজীবী আমির হোসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের শাসন, রক্ষী বাহিনী গঠন, শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ, পিলখানা হত্যাকা-সহ নানা প্রসঙ্গে প্রসিকিউশনের বক্তব্যের পাল্টা যুক্তি তোলে ধরেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের বিষয়ে আপত্তি তোলে আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, ‘এ আইনে মূল যে অ্যাভিডেন্স অ্যাক্ট (সাক্ষ্য আইন), সেটাকে প্রয়োগ করার কোনো সুযোগ নেই। সিআরপিসিও (ফৌজদারি কার্যবিধি) এ আইনে গ্রহণ করা যায় না। এ আইনে এমন একটি বিচার, যে বিচারে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়ে আসামিকে বলা হবে এখন সাঁতার কাটো।’

শুনানিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে রক্ষী বাহিনী গঠন প্রসঙ্গ তোলে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জাসদের তৎপরতা শুরু হয়। চুরি ও ডাকাতি শুরু হয়। ডাকাতদের নিয়ন্ত্রণ করতে বঙ্গবন্ধু রক্ষী বাহিনী গঠন করেন। সিদ্ধান্তে হয়তো কিছু ভুল ছিল। পরে কিন্তু রক্ষী বাহিনী বিলুপ্ত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর পর যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারা কি রক্ষী বাহিনীর বিচার করেছিলেন। যেহেতু করেননি, তাই এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না।’

আওয়ামী লীগের দুঃশাসন নিয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলে আইনজীবী বলেন, ‘তারা (প্রসিকিউশন) দুঃশাসনের পাশাপাশি সুশাসনের কথাও যদি বলতেন, তাহলে মেনে নিতাম। আওয়ামী লীগের সময় কোনো দুঃশাসন ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘প্রসিকিউশন বলেছে, “আওয়ামী ফ্যাসিবাদ”। কিন্তু আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশ ছিল উন্নয়নের মহাসড়কে। আগে কি উন্নয়নের এই চিত্র ছিল। উন্নয়নকে যদি বলা হয় দুঃশাসন, তাহলে সুশাসন কোনটি।’

আইনজীবী বলেন, ‘রাষ্ট্রের সঙ্গে পরিবারের একটি মিল রয়েছে। একটি পরিবারের সব সদস্য সমান হন না। পরিবারের প্রধান কি চান না সন্তান ভালো হোক? রাষ্ট্রপ্রধানের সেই চেষ্টা থাকে। সেই চেষ্টায় কিছু ভুলত্রুটি থাকে।’

এ সময় ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ অ্যাডভোকেট আমির হোসেনের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি উন্নয়নের কথা বললেন, কিন্তু বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম, অপহরণ ও খুন এগুলো কী?’

জবাবে আইনজীবী বলেন, ‘রাষ্ট্র চালাতে গেলে প্রয়োজনে অনেক কঠোর হতে হয়। সেই কঠোরতা প্রয়োগে কিছু ভুলত্রুটি হয়।’

একপর্যায়ে আইনজীবী দাবি করেন, ‘শেখ হাসিনাকে অপসারণ ছিল ডিজাইনের অংশ।’

তিনি আরও দাবি করেন, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের সময় আরও রক্তপাত এড়িয়ে তিনি (শেখ হাসিনা) বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান করেছিলেন।

শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে তিনি বলেন, ‘যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের লোক বসিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশে এমন হয়। প্রত্যেকটা লোকের একটা পক্ষ থাকে। একমাত্র পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নন। শেখ হাসিনা নিজস্ব লোক বসিয়েছেন, তাতে অপরাধটা কী হয়েছে? যদি এটি শেখ হাসিনার ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আগের সরকারগুলোরও ভুল ছিল।’

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সর্বগ্রাসী দুর্নীতি নিয়ে প্রসিকিউশনের বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ কথাগুলো (দুর্নীতির অভিযোগ) ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেসব অভিযোগ বিচারের মাধ্যমে প্রমাণিত। তাই এমন ঢালাও বক্তব্য গ্রহণ করার সুযোগ নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত