অভাব আসার কারণ

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০৪ এএম

অভাব কেবল অর্থনৈতিক সংকটের নাম নয়। এটি এক ধরনের অদৃশ্য সংকোচন, যা মানুষের জীবন থেকে প্রশান্তিও বরকত কেড়ে নেয়। অনেক সময় মানুষ ভাবেন, কঠোর পরিশ্রম করলেই রিজিক বাড়বে, সম্পদ জমবে, জীবন হবে সচ্ছল। কিন্তু কোরআন-হাদিস জানায়, রিজিক শুধু পরিশ্রমের ফসল নয়, এটি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও নির্ধারণের বিষয়। মানুষের আচরণ, আমল ও নৈতিকতা রিজিকের সম্প্রসারণ বা সংকোচনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কিছু কাজ রয়েছে, যা রিজিক বাড়িয়ে দেয়, আবার কিছু কাজ আছে, যা রিজিকের বরকত নষ্ট করে দেয়, এনে দেয় অভাব ও কষ্ট।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলো, নিশ্চয় আমার রব যাকে ইচ্ছা তার রিজিক সম্প্রসারিত করে দেন, আর যাকে ইচ্ছা তার রিজিক সংকুচিত করে দেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’ (সুরা সাবা ৩৬) যেসব কারণে রিজিক কমে বা অভাব আসে তা উল্লেখ করা হলো।

পাপাচার : যেসব কাজে মানুষের রিজিক সংকুচিত হয়, তার অন্যতম হলো, গুনাহের কাজ বা পাপাচার। হজরত সাওবান (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সৎকর্ম মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়ায় এবং দোয়া মানুষের তকদির পরিবর্তন করে। আর পাপ কাজের কারণে মানুষ তার প্রাপ্য রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)

অকৃতজ্ঞতা : নেয়ামতের শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় না করলে নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানবজীবন, কমে যায় রিজিক। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে মনে রেখো, আমার শাস্তিবড়ই কঠোর।’ (সুরা ইব্রাহিম ৭)

মিথ্যা কসম ও ধোঁকা : মিথ্যা কসম ও ধোঁকা আয়-উপার্জনের বরকত নষ্ট করে ফেলে। আর বরকত চলে যাওয়া মানেই রিজিকে সংকীর্ণতা। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বেচাকেনা করার সময় তোমরা অধিক কসম করা থেকে সাবধান থাকবে। কারণ, মিথ্যা কসম করলে বিক্রি বেশি হবে, কিন্তু বরকত হবে না।’ (সহিহ মুসলিম) তিনি আরও বলেছেন, ‘ক্রেতা ও বিক্রেতা চুক্তির মজলিশ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করা কিংবা বাতিল করার সুযোগ রয়েছে। যদি তারা সত্য বলে এবং পণ্যের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি মিথ্যা বলে এবং পণ্যের দোষ গোপন করে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত নষ্ট হয়ে যাবে।’ (সহিহ বুখারি)

সুদি লেনদেন : আপাতদৃষ্টে মনে হয় সুদি লেনদেন দ্বারা ব্যবসায় উন্নতি হচ্ছে। বস্তুত এতে ব্যবসার বরকত নষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং সদকাকে বর্ধিত করেন।’ (সুরা বাকারা ২৭৬)

জাকাত না দেওয়া : সম্পদের পরিশুদ্ধি লাভের ইসলামি বিধান জাকাত। এর মাধ্যমে ধনী-দরিদ্র্যের ভারসাম্য ঠিক রেখেছে ইসলাম। সঠিকভাবে জাকাত আদায় না করলে রিজিকের বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং এতে রিজিক সংকুচিত হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো জাতি জাকাত আদায় করা বন্ধ করে দেয়, আসমান থেকে তখন বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পৃথিবীর বুকে যদি চতুষ্পদ জন্তু জানোয়ার না থাকত, তাহলে আর কখনো বৃষ্টি হতো না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)

অবৈধ উপার্জন : মহান আল্লাহ মানুষকে হালাল রিজিক উপার্জনের নির্দেশ দেন এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার কথা বলেন। কেননা হারাম উপার্জনের কারণে রিজিকের বরকত কমে আসে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো।’ (সুরা বাকারা ১৬৮) তার এই নির্দেশ অমান্য করে হারাম পথে উপার্জন করলে রিজিকে বরকত কমে যায়।

এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যি ক্ত হালাল ও বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করে, তাকে বরকত দান করা হয়। আর যে ব্যক্তি হারাম ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করে, সে এমন ব্যক্তির মতো, যে আহার করেও তৃপ্ত হয় না। সে যতই ভক্ষণ করুক তার ক্ষুধা নিবারণ হয় না।’ (সহিহ মুসলিম) মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে হারাম থেকে বেঁচে হালাল উপার্জনের তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত