নতুন আইনে অস্থিতিশীল হবে পোশাক শিল্প: বিজিএমইএ

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৩৩ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫’ নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে এ সংখ্যা কমিয়ে ২০ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অন্তঃদ্বন্দ্ব ও শিল্পে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

বর্তমান শ্রম আইন অনুযায়ী ৫০ জন শ্রমিক মিলে কোনো কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারে।

মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) উত্তরায় সংগঠনটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, এটা বাস্তবতা বিবর্জিত। মাত্র ২০ জন শ্রমিক দিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠন করা হলে কারখানাগুলোতে এমন ব্যক্তিরা ট্রেড ইউনিয়ন করবেন, যারা ওই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। এর ফলে শিল্পে অস্থিরতা তৈরি হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমবে এবং উদ্যোক্তারা নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনায় নিরুৎসাহিত হবেন।

‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৫’ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিজিএমইএ বলছে—

১. ট্রেড ইউনিয়ন গঠন: ভারসাম্যহীন ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত

টিসিসি ও ওয়ার্কিং কমিটিতে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে ধাপে ধাপে শ্রমিকের সংখ্যা নির্ধারণে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল—  যেখানে প্রথম ধাপে ৫০ থেকে ৫০০ শ্রমিকের কারখানায় ন্যূনতম ৫০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় একতরফাভাবে সেটি পরিবর্তন করে ২০–৩০০ শ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ধাপ করা হয়েছে ৫টি।

আন্তর্জাতিক তুলনা করে তথ্য তুলে ধরে বিজিএমইএ বলছে, ভারতে ১০ শতাংশ শ্রমিক বা ন্যূনতম ১০০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন গঠন সম্ভব। পাকিস্তানে এ হার ২০ শতাংশ।

২. ‘ভবিষ্য তহবিল’ ও সর্বজনীন পেনশন ‘প্রগতি’—দ্বৈত জটিলতা

টিসিসি’র আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল—একটি প্রতিষ্ঠান চাইলে হয় ‘ভবিষ্য তহবিল’ বা ‘প্রগতি’ যেকোনো একটি স্কিম বেছে নিতে পারবে।

কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন দিয়েছে, শ্রমিক চাইলে দুটো পদ্ধতিতেই অংশ নিতে পারবে—যা উদ্যোক্তাকে দুইটি ভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থাপনা সমান্তরালে চালাতে বাধ্য করবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।

প্রতিযোগী দেশের উদাহরণ দিয়ে বিজিএমইএ জানায়, ভারতে শুধু ইপিএফ (এমপ্লয়ি প্রভিডেন্ট ফান্ড) বাধ্যতামূলক। ভিয়েতনামে ন্যাশনাল পেনশন অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম একক কাঠামো রয়েছে। এবং শ্রীলঙ্কায় ইপিএফ দ্বৈত পদ্ধতি নেই।

বিজিএমইএ বলছে, বাংলাদেশে দ্বৈত পদ্ধতি চালু করলে জটিলতা বাড়বে এবং মালিকপক্ষের প্রশাসনিক খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

৩. শ্রমিকের সংজ্ঞায় অস্পষ্টতা ও প্রশাসনিক ঝুঁকি

নতুন সংশোধনীতে শ্রমিকের সংজ্ঞায় ‘কর্মচারী/কর্মকর্তা’ যুক্ত করায় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্তর ও শ্রমিক স্তরের মধ্যে বিভাজন ভেঙে যাবে। এর ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, দায়িত্ব বণ্টনে বিভ্রান্তি তৈরি হবে এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মারাত্মক সমস্যা দেখা দেবে।

৪. প্রক্রিয়াগত অবিচার ও নীতিগত প্রশ্ন

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— ওয়ার্কিং কমিটি ও টিসিসি’র সভায় সকল পক্ষের অংশগ্রহণে যে সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল, উপদেষ্টা পরিষদ তার অনেকগুলোই আলোচনা ছাড়াই পরিবর্তন করে অনুমোদন দিয়েছে। এটি কেবল শিল্পপক্ষ নয়, বরং শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং সরকারের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ককেও দুর্বল করবে।

৫. প্রতিযোগিতার বাস্তবতা: বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে

বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো ইতোমধ্যেই প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং শ্রম আইন সংস্কারে বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে যদি এমন অযৌক্তিক শ্রম আইন কার্যকর হলে, বৈদেশিক বিনিয়োগ কমবে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, শিল্পে অস্থিরতা বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি দুর্বল হবে।

বিজিএমইএ বলছে, শ্রম আইন এমন হওয়া উচিত যা শ্রমিক ও শিল্প উভয়ের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত হয়। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে অনুমোদিত বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ পুনর্বিবেচনা করা হোক।

বিজিএমইএ দাবি, শিল্প, শ্রমিক ও অর্থনীতির বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। যাতে আইন যেন শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নষ্ট না করে, বরং টেকসই উন্নয়নকে সমর্থন করে।

সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি, পরিচালকসহ বর্তমান নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত