বিশ্ব চরাচরে সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদাবান হচ্ছে মানুষ। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মানবজাতির পরিচয় এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান ১১০) কোরআনের অপর স্থানে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও জলে তাদের বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিজিক দিয়েছি এবং বহু সৃষ্টির ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৭০)
আল্লাহতায়ালা মানুষকে দিয়েছেন জ্ঞান, বিবেক ও নৈতিকতার এমন এক সম্মান, যা অন্য কোনো সৃষ্টিকে প্রদান করা হয়নি। মানুষ শুধু দেহধারী প্রাণী নয়, বরং দায়িত্ব ও জবাবদিহির অর্পিত প্রতিনিধি। তাই মানুষের প্রাণ, মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম প্রধান নীতি। আল্লাহতায়ালা মানুষকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, যাতে সে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, অন্যের অধিকার রক্ষা করে এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করে। অথচ আজ মানুষের সেই মর্যাদা পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে। অব্যবস্থাপনা, লোভ, অনৈতিকতা ও অবিচারের কারণে মানুষ নিজেরাই একে অপরের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। কোনো কোনো মৃত্যু যেন দুর্ঘটনা নয়, অবহেলার ফল। ইসলাম এমন অবহেলাকেও ন্যায়বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় এবং সেটার যথার্থ ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়।
মহান আল্লাহ মানুষকে মর্যাদা দিয়েছেন, এখন মানুষ মানবীয় গুণাবলিতে গুণান্বিত হলেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিতে পরিণত হবে। কিন্তু মানুষ দুনিয়ার মোহে পড়ে নানা অপকর্ম ও অনিয়মে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নানা বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এতে মানুষ নিজেই নিজের সম্মান ও মর্যাদা নষ্ট করছে।
ইসলাম ধর্মে বড় অপরাধসমূহের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য হলো, মানুষ হত্যা করা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মানুষের অপমৃত্যু, যা হত্যারই নামান্তর। কেননা সব মৃত্যু হচ্ছে অব্যবস্থাপনার কারণে। এসব অব্যবস্থাপনা যেসব কারণে হচ্ছে তা দূর করতে হবে। এটা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব। নয়তো আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি হবে।
এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, ধর্ষণসহ নানা অপকর্মে প্রতিদিনই মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। গত এক যুগে এদেশে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষ শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই নিহত হয়েছে। দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা যেন এক মৃত্যুফাঁদ। এটা দেশ ও দেশের মানুষের অব্যবস্থাপনার কারণেই হয়েছে। রাস্তায় বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক আইন না মানা ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। আর সরকার সড়কের জন্য যে বাজেট দিয়েছে, কর্মকর্তারা তা খেয়ে সাবাড় করেছে। পরে সড়কে ব্যবহার করা হয়েছে মানহীন উপাদান-উপকরণ। এখন তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নানা অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে মানুষ নিহত হচ্ছে।
মানুষ হত্যা সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। বিনা অপরাধে কাউকে হত্যা করা পুরো মানবজাতি হত্যার সমান অপরাধ হিসেবে গণ্য। প্রাণনাশ করে বা প্রাণনাশের পরিস্থিতি তৈরি করে, এমন সব মাধ্যম ও কর্মকাণ্ডকে ইসলাম জোরালোভাবে নিষেধ করেছে। হত্যার শাস্তি ইসলামে খুবই কঠিন। ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করলে অনুরূপভাবে হত্যা এবং ভুলবশত হত্যা করলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান দেওয়া হয়েছে ইসলামে।
সম্প্রতি ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের কাছে পিলারের প্যাড খুলে এক পথচারীর ওপর পড়ায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিহত হন। এভাবে নিহত হওয়াকে ইসলাম ভুলবশত হত্যা হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। কেননা এটা মেট্রো কর্র্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার ফল। এই দুর্ঘটনায় কর্র্তৃপক্ষ নিহতের পরিবারকে মাত্র ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং নিহতের পরিবারে কেউ বেকার থাকলে তাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। মাত্র ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনরা মেট্রো কর্র্তৃপক্ষের তুমুল সমালোচনা করছেন।
এক্ষেত্রে নিহতের পরিবার কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাবে, তা কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত দেশগুলোতে দেওয়া হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘কোনো মুমিনকে হত্যা করা কোনো মুমিনের কাজ নয়, তবে ভুলবশত করে ফেললে (তা সম্পূর্ণ) ভিন্ন কথা। যে ব্যক্তি ভুলবশত কোনো মুমিনকে হত্যা করে, সে একজন দাস মুক্ত করবে এবং নিহত ব্যক্তির পরিবারকে রক্তের মূল্য পরিশোধ করে দেবে। তবে (স্বজনরা) যদি (ক্ষতিপূরণ) ক্ষমা করে দেয় (তাহলে তা ভিন্ন কথা)।’ (সুরা নিসা ৯২)
এই আয়াতে যে ক্ষতিপূরণের কথা বর্ণিত হয়েছে, সেটার বিস্তারিত বিবরণ হলো, নির্দিষ্ট বয়সের ১০০ উট বা সমমূল্য কিংবা মুদ্রার মাধ্যমে দিলে (হানাফি মাজহাব মতে) এক হাজার দিনার (এক দিনার সমান ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ) বা সমমূল্য কিংবা ১০ হাজার দিরহাম (এক দিরহাম সমান ২.৯৭৫ গ্রাম রুপা) বা সমমূল্য দিতে হবে। এই তিনটির যেকোনো একটি দ্বারা ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবে। (হেদায়া ৪/৪৬০, রাওয়াইয়ুল বয়ান ফি তাফসিরি আয়াতিল আহকাম ১/৩৬০, ফাতহুল কাদির ৮/৩০৪)
উল্লেখ্য, দিরহাম তথা রৌপ্য মুদ্রার ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাব ছাড়া বাকি তিন মাজহাব মতে ১২ হাজার দিরহাম পরিশোধ করতে হবে। আর ২০০ গরু বা ২ হাজার বকরি বা সেটার সমমূল্য দিয়েও ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়। (আল-মুগনি ১২/৬-৮)
বর্তমান বাজার অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সের ১০০টি উটের সর্বনিম্ন মূল্য ১৫ কোটি টাকা, ১ হাজার দিনারের মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা, ১০ হাজার দিরহামের মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। অপরাধী এই ক্ষতিপূরণ দিতে অক্ষম হলে অভিভাবক বা নিজ সম্প্রদায় তা বহন করবে। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক ১৫৬৯) হত্যাকারীর পরিবার এই ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে ইসলামি সরকার তা বহন করবে। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক ১৫৫৮) নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে যদি স্বেচ্ছায় অর্থাৎ কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ ছাড়া ক্ষমা করে দেয় তাহলেই শুধু এই ক্ষমা করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হবে। (সুরা নিসা ৯২)
মানবজীবনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা শুধু ধর্মীয় নয়, নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও বটে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিটি মানুষের প্রাণ অমূল্য। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অব্যবস্থাপনার কারণে যদি কোনো প্রাণহানি ঘটে, তবুও তা ইসলামি দৃষ্টিতে ‘ভুলবশত হত্যা’। এমন অবস্থায় সঠিকভাবে ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের দাবি। সমাজে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে শুধু আইন নয়, বিবেককেও জাগ্রত করতে হবে। তবেই প্রতিষ্ঠিত হবে আল্লাহ প্রদত্ত সেই সম্মান, যার জন্য মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার
