সেবার মানোন্নয়নে এআই ব্যবস্থা কাজে লাগানো হবে

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৫৭ এএম

দেশ রূপান্তর : সব ব্যাংকই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে জোর দিচ্ছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক কীভাবে উপকৃত হচ্ছে?

মো. সাব্বির হোসেন : ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন ব্যাংকিং সেবাকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই, যেকোনো সময়, যেকোনো স্থান থেকে সহজে তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছেন। ফান্ড ট্রান্সফার, ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট, মার্চেন্ট পেমেন্ট, এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো থেকে শুরু করে গ্রাহকরা মোবাইল রিচার্জ, স্টেটমেন্ট ডাউনলোড, এমনকি ডিপিএস-এফডিও খুলছেন মুহূর্তেই।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ফলে ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকাংশেই কমে গেছে, যা গ্রাহকদের সময়, অর্থ ও পরিশ্রম সাশ্রয় করেছে। দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার গ্রাহকদের জন্য সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের জীবনযাপনকে করে তুলেছে আরও স্মার্ট ও গতিশীল। শুধু ব্যক্তিগত লেনদেনই নয়, ব্যবসায়িক লেনদেনেও ডিজিটাল ব্যাংকিং আজ এক অনন্য সহায়ক মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আপনাদের উল্লেখযোগ্য নতুন ও উদ্ভাবনী সার্ভিস সম্পর্কে আমাদের জানাবেন। নতুন সার্ভিস চালুর ক্ষেত্রে আপনারা গ্রাহকদের চাহিদাসহ আর কী কী বিষয় বিবেচনায় নিয়ে থাকেন?

মো. সাব্বির হোসেন : গ্রাহকরা যেন তাদের প্রয়োজনীয় সব ব্যাংকিং সেবা এক প্ল্যাটফর্ম থেকে নিতে পারেন, সে লক্ষ্যে আমরা আমাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘আস্থা’-তে প্রতিনিয়ত নতুন ও উদ্ভাবনী সেবা যুক্ত করছি। এর মধ্যে বিকাশ-এর কিউআর কোডে পেমেন্টসহ যেকোনো কিউআর কোড পেমেন্ট সুবিধা অন্যতম, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে আমাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

যেকোনো ব্যাংক, এমএফএস বা পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারে (পিএসপি) দ্রুত ও নিরাপদে টাকা পাঠানোর সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে ‘আস্থা’ অ্যাপে। আমরা সম্প্রতি অ্যাপভিত্তিক ইনস্ট্যান্ট ডিজিটাল লোন অনুমোদন ও বিতরণ সেবা চালু করেছি। আমাদের এই উদ্ভাবনী ও অগ্রণী উদ্যোগ গ্রাহকদের ব্যাপকভাবে উপকৃত করছে।

নতুন কোনো সেবা চালুর আগে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই গ্রাহকের চাহিদা, ব্যবহারিক সুবিধা ও নিরাপত্তাকে। পাশাপাশি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, লেনদেনের নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা ও দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখার মতো বিষয়গুলোকেও আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখি।

দেশ রূপান্তর: সম্প্রতি আপনারা ‘আস্থা’ অ্যাপে ইন্সুরেন্স সেবা চালু করেছেন। এ সেবা সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত জানাবেন।

মো. সাব্বির হোসেন: হ্যাঁ, আমরা সম্প্রতি আস্থা অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল ইনস্যুরেন্স সেবা চালু করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক সেবাগুলোকে একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা, যাতে গ্রাহকরা তাদের দৈনন্দিন আর্থিক প্রয়োজন আরও সহজে পূরণ করতে পারেন।

এই নতুন সেবার মাধ্যমে গ্রাহকরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের বীমা পলিসির প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে পারবেন মাত্র কয়েক ক্লিকেই। এতে তাদের আর্থিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা হবে আরও কার্যকর ও ঝামেলাহীন।

বর্তমানে সেবাটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে আমরা ধীরে ধীরে আরও বৈচিত্র্যময়, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী ইনস্যুরেন্স প্রোডাক্ট যুক্ত করার পরিকল্পনা করছি, যাতে গ্রাহকরা আস্থা অ্যাপের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারেন।

দেশ রূপান্তর: ব্র্যাক ব্যাংকের কত শতাংশ গ্রাহক এখন ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করেন? ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনে ব্যাংকের অ্যাপ কীভাবে ভূমিকা রাখে?

মো. সাব্বির হোসেন: এগার লাখ গ্রাহক ব্র্যাক ব্যাংকের ‘আস্থা’ অ্যাপ ব্যবহার করছেন। আমাদের অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপটি গ্রাহকদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে, যা তাদের ২৪/৭ ব্যাংকিং লেনদেনের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। ‘আস্থা’ এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সর্বাধিক ব্যবহৃত ব্যাংকিং অ্যাপ।

ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনে ‘আস্থা’র ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকেও ব্যাংকিংয়ের মূলধারায় নিয়ে এসেছে। যেসব গ্রাহকের পক্ষে শাখায় যাওয়া সম্ভব নয়, তারা এখন ঘরে বসেই মাত্র একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে প্রায় সব ব্যাংকিং সুবিধা নিতে পারছেন।

শুধু তা-ই নয়, আস্থা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণদের জন্য ব্যাংকিংকে আরও সহজ, দ্রুত ও ঝামেলাহীন করে তুলেছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দেশ রূপান্তর: কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্যাশলেস বা নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে বাংলা কিউআর। বাংলা কিউআর প্রসারে আপনারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মো. সাব্বির হোসেন: বাংলা কিউআর প্রসারে ব্র্যাক ব্যাংক শুরু থেকেই অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলা কিউআর হলো নগদবিহীন অর্থনীতির ভিত্তি গঠনের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ, যা দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে আরও বিস্তৃত করবে।

আমাদের গ্রাহকরা এখন আস্থা অ্যাপের মাধ্যমে যেকোনো ব্যাংক বা ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের বাংলা কিউআর-এ সহজে ও নিরাপদে পেমেন্ট করতে পারেন। পাশাপাশি আমরা আমাদের মার্চেন্ট পার্টনারদের বাংলা কিউআর গ্রহণে উৎসাহ দিচ্ছি এবং ধীরে ধীরে বৃহত্তর ব্যবসায়িক পরিসরে এর ব্যবহার সম্প্রসারণ করছি। রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ উদ্যোগে অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষকে বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করেছি। আমরা মনে করি, এ উদ্যোগ ক্যাশ-টু-ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গঠনের মাধ্যমে ক্যাশলেস বাংলাদেশ কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এছাড়াও আমরা বাংলা কিউআর ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রচারণা ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যাতে ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকরাও এই সুবিধাটি গ্রহণে আগ্রহী হন। প্রতিবছর আমরা ঢাকাসহ নানা জেলায় কুরবানি ঈদের পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা দিয়ে আসছি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগকে আমরা পূর্ণ সমর্থন করি এবং ব্র্যাক ব্যাংক এমন উদ্যোগের অগ্রযাত্রায় একটি নির্ভরযোগ্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর: অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সাইবার ঝুঁকি প্রায়শই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্র্যাক ব্যাংকের কী কী পূর্বপ্রস্তুতি আছে?

মো. সাব্বির হোসেন: অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা আজকের ডিজিটাল যুগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যাক ব্যাংক শুরু থেকেই সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। আমরা আমাদের গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেনকে নিরাপদ রাখতে আন্তর্জাতিক মানদ- ও উত্তম চর্চা অনুসরণ করি।

আমাদের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এনক্রিপশন প্রযুক্তি, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং রিয়েল-টাইম ফ্রড মনিটরিং সিস্টেম-এর ওপর ভিত্তি করে, যা যেকোনো সম্ভাব্য সাইবার হুমকি দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধে সক্ষম।

আমরা নিয়মিতভাবে সিকিউরিটি অডিট, পেনেট্রেশন টেস্টিং, ও ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা করি, যাতে আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামো সবসময় আপডেটেড ও সুরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি, আমাদের কর্মীদের জন্য চলমান সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে আমরা তাদের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করছি। আমাদের সম্মানিত গ্রাহকদের মধ্যেও সাইবার নিরাপত্তা ও ফ্রড ঝুঁকি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

ব্র্যাক ব্যাংক বিশ্বাস করে নিরাপদ ডিজিটাল ব্যাংকিংই গ্রাহক আস্থার মূল ভিত্তি। তাই আমরা আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সাইবার নিরাপত্তাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কাজ করছি, যেন আপনি নিশ্চিন্তে উপভোগ করতে পারেন আমাদের অনলাইন ব্যাংকিং সেবা।

গ্রাহকদের সচেতন রাখাকেও আমরা গুরুত্ব দিই। এজন্য আমরা নিয়মিতভাবে সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তা, টিপস ও সতর্কতা প্রচার করি, যাতে তারা অনলাইন লেনদেনের সময় আরও সচেতন ও নিরাপদ থাকতে পারেন।

দেশ রূপান্তর: ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণে ব্র্যাক ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মো. সাব্বির হোসেন: আমাদের লক্ষ্য হলো গ্রাহকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল-ফার্স্ট ব্যাংকিং এক্সপেরিয়েন্স তৈরি করা, যেখানে ব্যাংকিং হবে সম্পূর্ণ স্মার্ট, সহজ ও নির্বিঘœ।

আমরা আমাদের আস্থা অ্যাপকে আরও সমন্বিত ও বুদ্ধিদীপ্ত (ইন্টেলিজেন্ট) প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে কাজ করছি, যেখানে ব্যাংকিং, ঋণ, বিনিয়োগ, বীমা ও পেমেন্ট সব ধরনের আর্থিক সেবা এক জায়গায় পাওয়া যাবে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকদের আর্থিক জীবনকে সহজতর করা এবং এক অ্যাপে তাদের সব প্রয়োজন পূরণ করা।

এ ছাড়াও আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার বাড়িয়ে গ্রাহকভিত্তিক পারসোনালাইজড সেবা দেওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। একই সঙ্গে ডিজিটাল অনবোর্ডিং, প্রসেস অটোমেশন এবং ইন্টারঅপারেবিলিটির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ও সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত