উপকূল জুড়ে ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকি

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২১ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় জেলাগুলোতে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে বরগুনা জেলা ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠেছে। উপকূলের অন্যান্য এলাকায়ও ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উপকূলের ১৯টি জেলায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এজন্য সরকার প্রকল্পও গ্রহণ করেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারি বা নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করা এই বৃষ্টির পানিই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকূলীয় জেলা বরগুনাবাসীর জন্য।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি গবেষণা টিম সম্প্রতি বরগুনা পরিদর্শন করেছে। বাসা-বাড়িতে প্লাস্টিকের পাত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করায় সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার ৯৫ শতাংশ পাত্রে এডিসের লার্ভা পেয়েছে তারা।

এক সময়কার শহুরে রোগ ডেঙ্গুতে চলতি বছরের ১০ মাসে উপকূলীয় জেলা বরগুনায় অন্তত ৫৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে (বেসরকারি হিসাবে)। সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শুধু পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে ৮৬৮ জন। সরকারি হিসাবে এ উপজেলায় মৃতের সংখ্যা দুজন হলেও বেসরকারি হিসেবে ৯ জন। তাছাড়া কক্সবাজার এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও দুই বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় অন্য জেলাগুলোও ডেঙ্গু ঝুঁকিতে রয়েছে।

জানতে চাইলে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের নোনা পানিতে আয়রন বেশি। এজন্য স্থানীয় মানুষজন বৃষ্টির পানিসহ অন্যান্য পানি দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখে। যে কারণে সহজেই এডিস মশা বংশ বিস্তার করছে।’

সম্প্রতি বরগুনা পরিদর্শন করেছেন এ গবেষক। এই অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এমনও বাড়ি পেয়েছি, যেখানে তিন মাস ধরে পানি জমিয়ে রেখেছে। কিন্তু এটাকে তারা কোনো সমস্যা মনে করছেন না। এমনকি মশার লার্ভা দেখানোর পরও তারা বিচলিত নন। কবিরুল বাশার বলেন, পানির সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি উপকূলের মানুষকে সচেতন করতে হবে। সরকারিভাবে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এদিকে, বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা লবণাক্ততাকবলিত।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও। ‘রিভার স্যালাইনিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ : এভিডেন্স ফ্রম কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলায় মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততায় আক্রান্ত হবে ১০টি নতুন এলাকা। উপজেলাগুলো হলো সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ; খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা; বাগেরহাটের মোংলা এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা। লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির জন্য উপকূলের অনেক মানুষের ভরসার স্থল বৃষ্টির পানি। এ পানি মটকা বা প্লাস্টিকের বড় ড্রামে করে ভরে রাখা হয় শুকনো মৌসুমে ব্যবহারের জন্য। আর এ পানিতে ডেঙ্গু ছড়ানো এডিসের বিস্তার ঘটছে।

এদিকে, গত ২৪ এপ্রিল পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের ‘ন্যাচার ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নোনাপানির মশা মিঠাপানির মশার চেয়েও ভয়ংকর ভূমিকা রাখতে পারে। সমুদ্রের নোনাপানি ও নদীর মোহনায় জন্ম নেওয়া এসব মশা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, পীতজ্বর ও ম্যালেরিয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। নদীর নোনাপানি এখন লোকালয়ের গভীরে পৌঁছে গেছে।’ তবে দেশে এখন পর্যন্ত নোনাপানিতে এডিসের বংশবিস্তারের কোনো তথ্য দেননি বিশেষজ্ঞরা।

হটস্পট বরগুনায় ১০ মাসে ৫৩ জনের মৃত্যু : বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত বরগুনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৯২০ জন। সরকারি হিসেবে এখন পর্যন্ত বরগুনা জেনারেল হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে ১৫ জন। তবে বেসরকারি হিসেবে ঢাকা, বরিশালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ও বাড়িতে এ রোগে অন্তত ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই রোগীর অধিকাংশই বরগুনা পৌর শহর ও সদর উপজেলার বাসিন্দা। একই সঙ্গে জেলার পাথরঘাটা, বামনা, বেতাগী ও আমতলীতেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙেছে। পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি হিসাবে বরগুনায় প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয় ২০২২ সালে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয় ৪৮৫ জন, মৃত্যু নেই। ২০২৩ সালে হাসপাতালে ভর্তি ৪ হাজার ৫৯২, মৃত্যু ৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৩৪ এবং চারজন মারা গেছে। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৮ হাজার ৯২০ এবং সরকারি হিসাবে মৃত্যু ১৫ জন।

মৃত্যুঝুঁকিতে দরিদ্ররা : বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দরিদ্র জেলে সিদ্দিক মোল্লা। গত ২০ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন তিনি। চিকিৎসকরা সিদ্দিক মোল্লার স্বাস্থ্যের অবনতি দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করলেও পরিবারের কাছে অর্থ না থাকার কারণে পাথরঘাটাতেই থাকতে হয় তাদের। অর্থাভাবে চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালের নির্জন এক কোণে নিঃশব্দে নিভে গেল সিদ্দিক মোল্লার প্রাণ। একটি মৃত্যুর সঙ্গে ভেঙে পড়ল একটি সংসার। স্ত্রী হারালেন স্বামীকে, সন্তান হারাল বাবাকে, বোন হারাল ভাইকে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন স্তব্ধ, শোকে নিথর। দরিদ্রতার অন্ধকারে মোড়ানো এ পরিবারে নেমে এসেছে বেদনাভারাক্রান্ত এক কালো মেঘ। শুধু সিদ্দিক মোল্লাই নয়। পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বরগুনা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অনেক রোগী আছে যাদের স্বজনরা টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যদি আইসিইউ ও সিসিইউ ব্যবস্থা থাকত তাহলে হয়তো মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে রোগীদের রক্ষা করা সম্ভব হতো।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রেজোয়ানুর আলম বলেন, ‘প্রত্যেকটা রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়ে থাকি। কিন্তু রোগীর অবস্থার অবনতি হলে তখন আমাদের কাছে বরিশালে রেফার করা ছাড়া আর কোনো অপশন থাকে না। আমরা বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে জনবলসহ আইসিইউ ও সিসিইউ ব্যবস্থা চালু করার জন্য চিঠি দিয়েছি। আশা করছি মন্ত্রণালয় থেকে শিগগিরই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

মশক নিধনে অবহেলা : বরগুনায় এখন পর্যন্ত যারা ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে তাদের অধিকাংশই বরগুনা পৌর শহর ও এর আশপাশের এলাকার বাসিন্দা। পৌরসভার বাসিন্দাদের অভিযোগ, এত মৃত্যু ও আক্রান্তের পর পৌরসভা থেকে নামমাত্র মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বরগুনার পৌর শহরের কাঠপট্টি খাল ও আমতলারপার খাল এডিস মশার আঁতুরঘর। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এডিস মশা। তবে পৌর কর্র্তৃপক্ষের দাবি মশা নিধনে পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে মেশিন দিয়ে নিধন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বরগুনা পৌর শহরের বাসিন্দা সহিদুল ইসলাম বলেন, পৌরসভা থেকে যেভাবে মশা নিধন কার্যক্রম করা হচ্ছে তাতে মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ করা যাচ্ছে না। একের পর এক মৃত্যু আমাদের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। সারা দিন সারা রাত মশার কয়েল জ¦ালিয়ে রেখেও নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না।

হাসপাতালে জনবল সংকট : ২০১৩ সালে বরগুনা সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত করা হয়। এরপর হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য পদে ২৩৩টি পদ মঞ্জুর করা হয়। ২৩৩টি পদের অনুকূলে লোক রয়েছেন ১২৩ জন। শূন্য রয়েছে ১১০টি পদ। এর মধ্যে ৫৮ জন চিকিৎসকের অনুকূলে চিকিৎসক রয়েছেন ২৪ জন। এই অল্পসংখ্যক চিকিৎসক ও লোকবল দিয়ে ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আশিকুর রহমান বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে আমাদের প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। এত সংখ্যক রোগীকে একসঙ্গে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের।

শয্যা সংকটে মেঝেতে রোগীর চিকিৎসা : চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসে বরগুনায় ডেঙ্গু প্রকট আকার ধারণ করে। এ সময় ওষুধ সংকট চরম আকার ধারণ করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংকট কাটিয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে শয্যা সংকট নিরসন কিংবা ল্যাব টেস্ট নিয়ে এখনো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ওয়ার্ডেই শয্যার সংকট দেখা দিয়েছে। বহু রোগীকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। নারী ও শিশু ওয়ার্ডসহ মেডিসিন ইউনিটেও একই অবস্থা। এতে করে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। শয্যার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে রক্ত পরীক্ষার কিট এবং স্যালাইনের সংকট। অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে টেস্ট করাতে ও স্যালাইন কিনে আনতে হচ্ছে।

একজন রোগীর স্বজন আবদুল্লা মামুন বলেন, ‘তিন দিন ধরে মেঝেতেই চিকিৎসা নিচ্ছে আমার ভাই। জায়গা নেই, ডাক্তার-নার্সরাও খুব ব্যস্ত। আবার হাসপাতালের ল্যাবে টেস্ট করা যাচ্ছে না, বাইরেই করাতে হচ্ছে। স্যালাইনও বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।’

বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মাদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘জুন-জুলাইতে প্রথমে বরগুনায় ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করে। এরপর আগস্টে কিছুটা কমলেও আবার সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতি হতে শুরু করেছে। আমাদের চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমরা সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছি।’

তিনি জানান, বরগুনার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে দফায় দফায় স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আইসিইউ ও সিসিইউ স্থাপনের বিষয়ে শিগগিরই তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত