জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি কী হতে পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সাত দিনের মধ্যে জানাতে অন্তর্বর্তী সরকার যে সময় বেঁধে দিয়েছে, তা আগামী মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে। দলগুলোর ভেতর তেমন আগ্রহ না থাকায় তাদের কাছ থেকে সরকারের কাছে এ বিষয়ে সর্বসম্মত অবস্থান জানানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায়, তা নিয়ে সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে দফায় দফায় কথা হচ্ছে। যে সিদ্ধান্তই সরকার দিক, তা সব প্রভাবশালী দল মেনে নেবে কি না সে বিষয়ে সরকারের ভেতর সংশয় আছে।
এই সংশয় কাটাতে সরকারের উপদেষ্টাদের কয়েকজন ও তাদের হয়ে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলগুলোর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না এলে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে সরকার সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তার আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দলগুলোকে কথা বলার জন্য আবারও ডাকতে পারেন এমন সম্ভাবনা আছে।
সরকারের ভেতরকার তথ্য অনুযায়ী, সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তির উপায়, গণভোটের সময়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যকার মতভেদ বিবেচনায় নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার শক্ত অবস্থান নিতে পারে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার একটি ভারসাম্যমূলক সিদ্ধান্ত দিলে জাতীয় নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানের স্বার্থে দলটি তা মেনে নিতে পারে। তবে সরকার কোনো দলের অবস্থানের প্রতি ঝুঁকে সিদ্ধান্ত নিলে আর ছাড় না দেওয়ার ভাবনাও বিএনপির আছে।
বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশের সন্দেহ, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টানা কয়েক মাস শলাপরামর্শ করে সনদ তৈরি ও তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এখন একই বিষয়ে দলগুলোর কাছ থেকে নির্দেশনা চাওয়া সময়ক্ষেপণের কৌশল হতে পারে। অন্তত দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলসহ কয়েকটি মহল অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় থাকা দীর্ঘায়িত করতে চায়, এমন তথ্যের ভিত্তিতে এ সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে গতকাল শনিবার বলেন, ‘সনদে স্বাক্ষর করে এটি বাস্তবায়নে সব দলই অঙ্গীকার করেছে। কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, সেটি সরকারকে বলতে হবে।’ তিনি বলেন, এ ইস্যুতে চলমান জটিলতা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার কোনো পরিকল্পনা কি না সেটি খতিয়ে দেখতে হবে।
দলগুলোর মধ্যে এখন মূল মতবিরোধ রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য তৈরি করা জুলাই সনদে বাস্তবায়নের ওপর গণভোট কবে হবে, তা নিয়ে। বিএনপি চায় একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। জামায়াত আগে গণভোট পরে সংসদ নির্বাচন চায়। এনসিপি চায় সনদের সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ও তা বাস্তবায়ন। সরকারের ওপর চাপ জারি রাখতে চলমান রাজনীতিতে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতসহ আট দল একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে চলেছে। আগামী মঙ্গলবার আট দল রাজধানীতে বড় সমাবেশ ডেকেছে। এনসিপি নেতারাও সনদের আইনি ভিত্তি না মিললে মাঠে নামার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারকে নিরপেক্ষতার সঙ্গে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যাবতীয় কর্মকান্ড করার আহ্বান জানান। অন্তর্র্বর্তী সরকারের উদ্দেশে তিনি গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা আপনাদের সমর্থন করেছি, করব ওই সীমারেখার মধ্যে। আর যদি মনে করেন, আরেকটি রাজনৈতিক দল দিয়ে আমাদের আহ্বান জানাবেন আলোচনার জন্য। তাহলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তারা কারা?’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা যদি আমাদের আহ্বান জানান কোনো বিষয়ে আলোচনা করার জন্য, যেকোনো ইস্যুতে, আমরা সব সময় আলোচনায় আগ্রহী, যাব। কিন্তু অন্য কোনো একটি রাজনৈতিক দল দিয়ে আমাদের আহ্বান জানানো হচ্ছে কেন?’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই মুহূর্তে কোনো দল নির্বাচন চায়, কোনো দল নির্বাচন চায় না। যারা চায় না তারা জটিলতা সৃষ্টি করে নির্বাচন দূরে নিয়ে যেতে চায়। আমি মনে করি, ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্যই জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
জটিলতা থেকে সরকার ও দলগুলোর বের হয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দল সবাইকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
