মহাবিদ্রোহের মহানায়ক তিতুমীর

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:৩৫ এএম

১৭৯৩ সালে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিং চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে নতুন ভূমিব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এই ভূমিব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কর প্রদানের মাধ্যমে কৃষিভূমির মালিকানার অধিকারী হওয়ার ব্যবস্থা আসে। এই ব্যবস্থা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ‘জমিদার’ নামের নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তাই প্রচলিত অর্থে ‘জমিদারি প্রথা’ বলেও পরিচিত। জমিদাররা উচ্চহারে কর পরিশোধ করতে দরিদ্র কৃষকদের ওপর উচ্চহারে খাজনা দাবি করে। তাদের বিলাসি জীবন চালানো ও ইংরেজদের উচ্চকর পরিশোধ করার অর্থ জোগান দিতে গিয়ে বাংলার কৃষকরা হতে থাকে নিঃস্ব। এ সময় এই অত্যাচারের প্রতিবাদে বেশ কিছু বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এসব বিদ্রোহের নানা কারণ ও রূপ থাকলেও সবগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এ সময়ে বিদ্রোহগুলোর মধ্যে তিতুমীরের বিদ্রোহ অন্যতম এবং নানা কারণে উজ্জ্বল।

তিতুমীর ১৭৮২ সালে চব্বিশ পরগনা জেলার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চাঁদপুর গ্রামের সম্পন্ন কৃষক পরিবারে তার জন্ম। তিনি শৈশবে গ্রাম্য মক্তবে কোরআন শিক্ষা শেষ করে স্থানীয় মাদ্রাসায় ভর্তি হন। আঠারো বছর পর্যন্ত আরবি-ফার্সি মাধ্যমে ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করেন। তার নাম ছিল মীর নিসার আলী। ডাক নাম ছিল তিতু বা তিতুমীর। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তিতুমীর নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পড়াশোনার পাশাপাশি কিশোর তিতুমীর খেলাধুলায় দক্ষতার পরিচয় দেন। মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে তিনি ভাগ্যান্বেষণে কলকাতা শহরে যান এবং কুস্তিগির হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। মির্জাপুরের জমিদার মির্জা আম্বিয়া ছিলেন খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী। তরুণ কুস্তিগির তিতুমীর তার সুনজরে পড়েন এবং আনুকূল্য লাভ করেন। এ সময়ে তিনি নদিয়ার জমিদারের অধীনে চাকরি নেন। সম্ভবত নদিয়ার জমিদারের পক্ষে যুবক তিতুমীর লড়ায়েও অংশ নিয়েছিলেন এবং সেজন্য তাকে কারাবরণও করতে হয়। ১৮২২-২৩ সালের দিকে তিনি দিল্লির রাজপরিবারের একজন সদস্যের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তার সফরসঙ্গী হয়ে মক্কায় যান। ১৮২৪ থেকে ১৮২৭ সাল পর্যন্ত তিন-চার বছর তিনি মক্কায় অবস্থান করেন। মক্কায় অবস্থানকালে তিনি ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন এবং ইসলামের মূল বিষয়গুলো কঠোরভাবে পালনের মত অবলম্বন করেন। বিশুদ্ধ ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে তিনি সুবিচার, বিশ্বভ্রাতৃত্ব সামাজিক সাম্য, খোদাপ্রেম এবং নবীর প্রতি ভালোবাসার প্রেরণা সাধারণ মানুষের ভেতর ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার ধর্মপ্রচার উত্তর ভারত ও বাংলার মুসলমানদের ভেতর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। দেশে ফিরে তিনি শন্তিপূর্ণভাবে মুসলিম বাঙালিকে ধর্মীয় ন্যায়নীতির শিক্ষা দিতে শুরু করেন। এ সময় তিনি দিল্লির পৃষ্ঠপোষকের কাছ থেকে ভাতা পেতেন। ১৯২৮ সালের দিকে তিতুমীর বাঙালি মুসলমানদের নেতা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এ সময় তিনি তিনশ থেকে চারশ জনের একটি অনুসারী দল গড়ে তোলেন, যারা ইসলামের মূল নিয়মনীতি পালন করতেন। তাদের পোশাক এবং জীবন পদ্ধতি সাধারণ মুসলমানদের থেকে আলাদা ছিল।

অনেক জমিদারই তাদের প্রজাদের ওপর নতুন ধরনের কর আরোপ করেন। তিতুমীর এর প্রতিবাদ করেন এবং দুপক্ষের মধ্যে লড়াইপূর্ব অবস্থা সৃষ্টি হয়। এরা তাদের জমিদারিতে পাঁচ ধরনের নতুন কর আরোপ করেন। এগুলোর মধ্যে মাথাপিছু আড়াই টাকা ‘দাড়ি কর’ উল্লেখযোগ্য। নতুন করের আওতায় জমিদাররা তিতুমীরের কয়েক অনুসারীকে জরিমানা করেন এবং নানা রকম হয়রানির শিকার করেন। এভাবে রায়ত এবং জমিদারদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে।

এই জমিদাররা তিতুমীরের অনুসারীদের প্রতি দুর্ব্যবহার করেন এবং অবৈধভাবে ‘দাড়ি কর’ আদায় করেন। এই দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে তিতুমীর শক্তি প্রয়োগ না করে আইনের আশ্রয় নেন। ১৮৩০ সালের ৭ আগস্ট বারাসাতের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে একটি মামলা করেন। কিন্তু ১৮৩১ সালের ১৩ জুলাই এই মামলা খারিজ হয়ে যায়। মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ায় জমিদারদের স্বৈরাচারী মনোভাব বৃদ্ধি পায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার আর কোনো উপায় না থাকায় তিতুমীরকে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিতে হয়। এ সময় অবৈধ কর আদায়ের তৎপরতা আরও জোরদার হয়। তিতুমীরের অনুসারীরা কর আদায়কারীদের মারধর করেন এবং কয়েকজনকে আটক করে রাখেন। খবর পেয়ে জমিদার কৃষ্ণদেব রায় উত্তেজিত হয়ে ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী নিয়ে নিজেই বেরিয়ে পড়েন। জমিদার একটি সরফরাজপুরের জামে মসজিদের মুসুল্লিদের ওপর আক্রমণ করেন। এতে দুজনের মৃত্যু হয় এবং কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষ পুলিশের কাছে অভিযোগ করে।

পুলিশ ফাঁড়িতে জমিদার অভিযোগ করেন, সরফরাজপুরের গ্রামবাসী জোরপূর্বক তার কয়েকজন অনুচরকে আটক রেখেছে। গ্রামবাসী তাৎক্ষণিক অভিযোগ করে, জমিদার তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য মসজিদ পুড়িয়ে দিয়েছেন। তদন্তে পরিস্থিতি বিপজ্জনক দেখতে পেয়ে মুহুরি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যেন বশিরহাট থানার অভিজ্ঞ সাব-ইন্সপেক্টর রামরাম চক্রবর্তীকে ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঘটনার আঠারো দিন পর জমিদার কৃষ্ণদেব রায় এই মর্মে পাল্টা আরেকটি মামলা করেন যে, গ্রামবাসী তার তিন অনুচরকে মারধর করে এবং তাকে অভিযুক্ত করার জন্যই মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় জমিদার সমস্ত গ্রামবাসী এবং তাঁতীদের অভিযুক্ত করেন। দারোগা রামরাম চক্রবর্তী পক্ষপাতমূলক তদন্ত করেন এবং দারোগার দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে অবশিষ্ট সাক্ষীরা পালিয়ে যায় অথবা সাক্ষী হিসেবে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। দারোগা তার চূড়ান্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেন, গ্রামবাসীর অসহযোগিতার কারণে তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি।

মামলা চলাকালে তিতুমীরের অনুসারীরা খোলাখুলিভাবেই জমিদারের পক্ষাবলম্বনের জন্য দারোগাকে অভিযুক্ত করেছিলেন। ১৮৩১ সালের ২ সেপ্টেম্বর যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার সাহেব কোনো শাস্তি না দিয়েই বিচার শেষ করেন। তবে নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষকে ৫০০ টাকা করে জামানত রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। মামলার ফলাফলে কৃষ্ণদেব রায় আরও সাহসী হয়ে পরবর্তী সময়ে রায়তদের পক্ষের সাক্ষীদের নানাভাবে হয়রানির মধ্যে ফেলতে থাকেন।

আইনের মাধ্যমে সুবিচারের চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ায় কৃষ্ণদেব রায়ের দলের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যান তিতুমীরের অনুসারীরা। নানামুখী সংঘর্ষ, সন্দেহ, হয়রানিমূলক পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া তিতুমীরের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

তিতুমীরের অনুসারী দল ১৮৩১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত নারকেলবাড়িয়ায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন। জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের সঙ্গে তখন তিতুমীরের সংঘর্ষ বেঁধে যাওয়া ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার। জমিদারের গোয়েন্দারা তিতুমীরের অনুসারীদের ওপর সতর্ক নজর রাখেন। কিন্তু তিতুমীরের অনুসারী সুযোগ পেয়ে যান। তারা গ্রাম আক্রমণ করেন। এই আক্রমণ ছিল মসজিদ ধ্বংসের পাল্টা আক্রমণ। দুই ব্যক্তিকে মারধর করা ছাড়া তিতুমীরের অনুসারীরা পুঁড়া গ্রামে লুট বা সম্পদ নষ্ট করার মতো কোনো ঘটনা ঘটায়নি। ধারণা করা হয়, যে দুই ব্যক্তিকে তারা প্রহার করে তারা তিতুমীরের কর্মকা-ে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছিল। এ আক্রমণের পর তিতুমীর বুঝতে পারেন বড়সড় একটি সংঘর্ষ এগিয়ে আসছে। তিনি তখন একটি কেল্লা বানানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

তিতুমীরকে শায়েস্তা করার জন্য অন্য জমিদারদের সহযোগিতায় কৃষ্ণদেব রায় যে বাহিনী গড়ে তোলেন তাতে মাস দুয়েক সময় লেগে যায়। কৃষ্ণদেব গোবরার জমিদার কালীপ্রসন্ন রায় এবং কলকাতার লাটুবাবুর সহযোগিতা নিয়েছিলেন। লাটুবাবু দুইশ হাবসি সৈন্য প্রেরণ করেছিলেন। হাবসি যোদ্ধারা দেবনাথ ও ডেভিডের দলের সঙ্গে দ্রুত যোগ দেয় এবং এই সম্মিলিত শক্তি ৭ নভেম্বর তিতুমীরের বাহিনীর সঙ্গে দিনভর যুদ্ধ চালায়। লাউঘাটির যুদ্ধে তিতুমীরের বিজয় হয়। ফলে ওই অঞ্চলে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কৃষরা তাকে ওই অঞ্চলের অঘোষিত প্রশাসক হিসেবে গণ্য করতে থাকেন। তার প্রতি গ্রামবাসীর সমর্থনও বৃদ্ধি পায়।

মানুষের মুখে মুখে তিতুমীরের বীরত্বের কথা ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ সাহসী হয়ে ওঠে এবং ইংরেজ ও জমিদাররা ভিত হয়ে পড়েন। গ্রামবাসীর মধ্যে জমিদারের প্রভাব কমে যায়। তিতুমীরকে দমন করার জন্য এবার এগিয়ে আসেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার। ১৮৩১ সালের ১৫ নভেম্বর মি. আলেকজান্ডার তার সঙ্গে বশিরহাট পুলিশ এবং বেসামরিক সেনাদের সমন্বয়ে ১২৫ জনের একটি বাহিনী নিয়ে নারকেলবাড়িয়ায় উপস্থিত হন। পক্ষান্তরে তিতুমীরের চার-পাঁচশ অনুসারী লাঠি, তলোয়ার, বর্শা ও অন্যান্য অস্ত্রসহ প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত ছিল। আলেকজান্ডার প্রথমে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বিদ্রোহীরা এতে ভয় না পেয়ে লাঠি বাগিয়ে সিপাহিদের সম্মুখযুদ্ধে আহ্বান করে। আলেকজান্ডার আবার ফাঁকা আওয়াজের নির্দেশ দিলে বন্দুক প্রস্তুত করার আগেই তিতুমীরের প্রধান সহকারী গোলাম মাসুদের নেতৃত্বে তিতুমীরের যোদ্ধারা সিপাহিদের ওপর আক্রমণ করে। দীর্ঘক্ষণের সম্মুখসমরে ১০ জন সিপাহি, তিনজন বন্দুকবাজ এবং একজন জমাদার মারা যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে বারাসাতের যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার আলেকজান্ডার পালিয়ে যান। বিদ্রোহীরা কয়েকজন বরকন্দাজ ও তিতুমীরের পরম শত্রু বশিরহাট থানার দারোগা রামরাম চক্রবর্তীকে বাঁশের কেল্লায় আটক করে এবং পরে হত্যা করে।

আলেকজান্ডারের পলায়নের পরপর নদিয়ার ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার স্মিথ নারকেলবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি এর আগের আক্রমণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি আলেকজান্ডার সাহেবের কাছে চিঠি লিখে সামরিক বাহিনী তলব করেন। তার সঙ্গে ২০০ থেকে ৩০০ অনুগামী ছিল। তারা ১২ থেকে ১৪টি দোনলা বন্দুক বহন করছিল। তিনি দেখতে পান, তিতুমীরের সঙ্গীদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় আছে। স্মিথ পিছিয়ে যেতে চাইলে তিতুমীরের অনুসারীরা তাদের ধাওয়া শুরু করে। প্রাণরক্ষার্থে স্মিথ সাহেব গুলি ছুড়লে একজন বিদ্রোহী নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। বিদ্রোহীরা নৌকা নিয়ে স্মিথ সাহেবদের ধাওয়া করতে শুরু করে। তবে তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

ইংরেজ প্রশাসকদের পরপর দুটি অভিযানই বিদ্রোহী তিতুমীরের শক্তির কাছে ব্যর্থ হয়ে যায় এবং যমুনা ও ইছামতির তীরবর্তী বিশাল গ্রামাঞ্চল তিতুমীরের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তারা পূর্ববর্তী নবাবি রীতিনীতিতে গ্রাম নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে এবং বাঁশের কেল্লায় অবস্থান করতে থাকে। অঞ্চলটি এক প্রকার মুক্ত অঞ্চল হয়ে যায়। তবে পরবর্তী সামরিক অভিযানের মুখে তিতুমীর আর দাঁড়াতে পারেননি। স্থানীয় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে কামানের গোলা আটকাতে পারেনি তিতুমীরের অনুসারীরা।

পরিস্থিতি বিপজ্জনক বুঝতে পেরে বারাসাতের সার্কিট কমিশনার বারওয়েল সাহের কলকাতায় অবস্থানকারী ডেপুটি সেক্রেটারি মিস্টার থমসনকে জানান যে, আলেকজান্ডার সাহেবের গ্রহণ করা পদক্ষেপ যেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন কাউন্সিল অনুমোদন করেন। বারওয়েল সাহেবের প্রস্তাব কাউন্সিলে অনুমোদিত তো হয়ই, উপরন্তু গোলযোগ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে কলকাতার মিলিশিয়া বাহিনী ব্যবহার করার জন্য ক্ষমতা প্রদান করে।

তিতুমীর শুধু জমিদার নয়, ইংরেজ সাহেবদের ওপরও চড়াও হয়েছেন জানতে পেরে কলকাতায় অবস্থানকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন কাউন্সিল সামরিক অভিযানের হুকুম দেন। ব্যারাকপুরের সম্পূর্ণ স্থানীয় পদাতিক ও গোলন্দাজ বাহিনী তিতুমীরকে শায়েস্তা করতে অগ্রসর হয়। তারা ছয় পাউন্ড ওজনের কামান ব্যবহারের অনুমতি লাভ করে। বারাসাতে এই বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়

তৃতীয় হালকা অশ্বারোহী বাহিনীর ১২ সদস্য এবং একজন হাবিলাদার। মিস্টার আলেকজান্ডারকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যেন তিনি বিদ্রোহীদের অবস্থান, অভিযানের মেয়াদ, সৈনিকদের জন্য খাদ্য সরবরাহ প্রকৃতির সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াসহ বারাসাতের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। অন্যদিকে তিতুমীরের অনুসারীরা দু’দুটি আক্রমণে জয়ী হয়ে ঘোষণা দেন যে, এখন থেকে কোম্পানি আইন বিলুপ্ত হলো।

১৭ নভেম্বর মেজর স্কটের নেতৃত্বে একাদশ স্থানীয় পদাতিক সৈন্যদল এসে পৌঁছে। ক্যাপ্টেন মাদারল্যান্ডের নেতৃত্বে গোলন্দাজ বাহিনী এসে পৌঁছে। সমন্বিত সেনাবাহিনীর সর্বময় কর্তৃত্বে ছিলেন মেজর স্কট হার্ডি। মূল আক্রমণ শুরু হয় ১৯ নভেম্বর সকালে, যখন পদাতিক বাহিনী নারকেলবাড়িয়া পৌঁছে। গ্রামের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য কামানগুলোকে টেনে আনা হয়। ইংরেজ বাহিনী যখন আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, বিদ্রোহীরা তখন ময়দানে জড়ো হয়ে ইংরেজবিরোধী এবং ইসলামের পক্ষে সেøাগান দিচ্ছিল। তারা ছিল ঢাল, তলোয়ার, বর্শা প্রভৃতি অস্ত্রে সুসজ্জিত এবং সংখ্যায় পনেরোশর বেশি। ইংরেজদের প্রথম রাউন্ড গুলিবর্ষণের সময়ও এরা সুশৃঙ্খল বাহিনীর মতো আত্মরক্ষা করে সেøাগান দিতে থাকে। কিন্তু ক্রমাগত গোলাবর্ষণের কারণে আর টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে বাঁশের কেল্লার দিকে পিছু হটে যায়।

তিতুমীর গবেষক বিহারীলাল সরকারের মতে, তিতুমীরের দল কোনো ধরনের আক্রমণে না গিয়ে মিসকিন শাহর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কথিত আছে, মিসকিন শাহ অলৌকিক ক্ষমতাবলে গুলি ও কামানের গোলা খেয়ে ফেলতে পারতেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ফকির মিসকিন শাহ এ সময় তাদের ত্যাগ করেন। নির্বিচার গুলি ও কামানের গোলাবর্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম রাউন্ড গুলিবর্ষণের পর বিরতির সময় কেল্লা থেকে ছোট একটি দল বের হয়। ইংরেজ বাহিনী এই দলের প্রত্যেককে গুলি করে হত্যা করে। কিছু বিদ্রোহী আত্মরক্ষার জন্য গাছে চড়লে সৈন্যরা তাদের গুলি করে নামিয়ে ফেলে। কামানের গোলায় বাঁশের কেল্লায় আগুন ধরে গেলে তিতুমীরের অনুসারীরা গ্রামের পথে পালাতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টা আক্রমণে যুদ্ধ শেষ হয়। এতে নিহত হয়েছিল ৫০ জন, আহত ৩০ জন এবং ২৫০ জন হয়। ২১ নভেম্বর পর্যন্ত বন্দির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫০।

সামরিক অভিযানে যে ৫০ বিদ্রোহী মারা যান তাদের মধ্যে তিতুমীরও ছিলেন। তিতুমীরের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা সম্ভব হয়নি। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই জনদরদি ধার্মিক ব্যক্তিত্ব প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ইংরেজদের হাতে জীবন দেন। ন্যায় ও আদর্শের পথে থেকে অন্যায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের যে দৃষ্টান্ত তিতুমীর স্থাপন করেছেন, বাঙালি জাতির জন্য আজও তা অনুসরণযোগ্য।

লেখক : প্রাবন্ধিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত