ব্রাজিলের উষ্ণতম শহর বেলেম। গতকাল তাপমাত্রা ছুঁয়েছে প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর মধ্যেই স্থানীয় আদিবাসীদের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন শহরকে করে তুলেছে উত্তপ্ত। আন্দোলন ঠেকাতে কপ ভেন্যুসহ বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী।
আমাজনের আদিবাসী সম্প্রদায় বন উজাড়, খনি সম্প্রসারণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও ভূমি অধিকারের হুমকির প্রতিবাদে একের পর এক বিক্ষোভ, শোকমিছিল, অবস্থান কর্মসূচি এবং মানববন্ধন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি: ‘আমাজনের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে হবে; করপোরেট স্বার্থ নয়, মানুষের জীবন ও প্রকৃতি সুরক্ষাই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।’
আদিবাসীদের অভিযোগ, ৩০তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-৩০) তাদের অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও আলোচনায় তা অধিভুক্তই হয়নি। মূল ভেন্যুতে প্রবেশে বাধা, হামলাসহ নানা নেতিবাচক আচরণ করছে জাতিসংঘ ও ব্রাজিলের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরিবেশ রক্ষার চেয়ে পরিবেশকর্মীদের ঠেকানোতেই বেশি মনোযোগী সংশ্লিষ্টরা।
মুন্দুরুকু আদিবাসী গোষ্ঠীর এক নেতা বলেন, ‘যৌক্তিক দাবি নিয়ে এসেও উন্নত বিশ্ব কথা শোনেনি। যাদের জন্য এ আয়োজন, তাদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনেক বছর ধরে আদিবাসীদের উন্নয়নে কপ কাজ করছে না, অথচ প্রতিমুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। জাতিসংঘ ও কপ কীভাবে আমাদের মূল্যায়ন করে, তা দেখতেই এসেছি।’
কপ গেটে আদিবাসীদের ওপর হামলাকে জলবায়ু সম্মেলনের ‘কালো অধ্যায়’ আখ্যা দিয়ে তারা জাতিসংঘের কাছে বিচার দাবি করেছেন। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন থেকে আদিবাসীরা মূল ভেন্যুতে ঢুকে বিক্ষোভের চেষ্টা করছেন। প্রধান ফটকে তাদের দমাতে শক্তি প্রয়োগ করে ব্রাজিল ও জাতিসংঘের বাহিনী। ফলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। সম্মেলনস্থলে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়ায় ডেলিগেটদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
আমাজন রক্ষার দাবিতে বেলেমের পাশ দিয়ে বয়ে চলা গুয়াজারা নদীতে প্রায় পাঁচশ নৌযানে ২০০ দেশের ১৫ হাজার পরিবেশকর্মী ভেসে ভেসে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে প্রতিবাদ করেন। উন্নত বিশ্বের টেকসই উদ্যোগের অভাবে তারা ক্ষুব্ধ। সম্মেলনের পঞ্চম দিনে স্থানীয় আদিবাসীরা কপের মূল গেট আটকে প্রায় এক ঘণ্টা প্রতিবাদ করেন।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশকর্মীদের ওপর হামলা জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। লস অ্যান্ড ড্যামেজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া ও আদিবাসী অধিকারের আলোচনায় অনুপস্থিতি সম্মেলনের গুরুত্ব কমাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ শরীফ জামিল বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতির কথা তুলে ধরবে। কিন্তু উন্নত দেশগুলো ক্ষতিপূরণের পথে বাধা দিতে নতুন ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে আসছে।’
সম্মেলনের প্রথম সপ্তাহে দর কষাকষি শেষে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। ধারণা, আদিবাসীরা অধিকার আদায়ে আরও সোচ্চার হবেন।
বাংলাদেশের পক্ষে জলবায়ু তহবিল প্রাপ্তি সহজ করার দাবি উঠেছে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন শাহ আদনান মাহমুদ। তিনি বলেন, স্থায়িত্বশীল নগর উন্নয়ন ও সবুজ জ্বালানিতে বিশ্বের আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ। একাধিক দেশের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খোঁজা হচ্ছে। অভিযোজন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহায়তা জরুরি।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, প্রথম দিনের আশা জাগানো সূচনার পর অর্থায়ন, কার্বন ট্রেডিং ও প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যপূরণে গতি নেই। কপ-৩০ এ প্রথমবার জীবাশ্ম জ্বালানি হ্রাস ও নবায়নযোগ্য শক্তি রূপান্তরের রূপরেখা কেন্দ্রে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলার রোডম্যাপকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে সমর্থন দিয়েছে বিভিন্ন দেশ। উন্নয়নশীল দেশগুলো সহজলভ্য অর্থায়ন চায়। আফ্রিকা উন্নয়ন বাধাহীন রাখতে জোর দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য খনিজ উত্তোলন ঝুঁকি বাড়াতে পারে, বিশেষত আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। বাংলাদেশ খনিজ উৎপাদক না হলেও সৌর, বায়ু ও ব্যাটারি প্রকল্পের খরচ-সরবরাহে প্রভাব পড়বে। সরবরাহ চেইনে পরিবেশ ও মানবাধিকার ঝুঁকিতে।
সম্মেলনের ভেতরে-বাইরে কৃষি ব্যবসা, খনন, পরিবহন, নারী অধিকার, ফিলিস্তিন, আদিবাসী ভূমি সীমানা নিয়ে প্রতিদিন প্রতিবাদ, নৌবহর মিছিল চলছে। নাগরিক সমাজের দাবি ‘বেলেম অ্যাকশন মেকানিজম’ গঠন, জাস্ট ট্রানজিশন সমর্থন ও সিদ্ধান্তে শ্রমিক-সম্প্রদায়কে কেন্দ্রীয় ভূমিকা। কায়াপো নেতা রাওনি মেটুকটিরে সতর্ক করেন, আমাজন ধ্বংস অব্যাহত থাকলে বিশ্ব ভয়ংকর পরিণতির মুখে পড়বে।
ব্রাজিলিয়ান আমাজনের আদিবাসী সংগঠন কোইয়াবের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩-২০২৫ সালে আমাজন সাম্প্রতিক ইতিহাসের তীব্রতম খরা ও দাবানলের মুখে। ২০২৪ জুনে ৮.৭ লাখ হেক্টর থেকে সেপ্টেম্বরে ২ কোটি ১০ লাখ হেক্টরে পৌঁছছে মাত্র তিন মাসে ২৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৬০টির বেশি আদিবাসী অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত। এল নিনো, উত্তর আটলান্টিকের উষ্ণতা, বন উজাড় একত্রে সংকট তীব্র করেছে। কোইয়াব বলছে, আদিবাসী সুরক্ষার কার্যকর উপায় ভূমি সীমানা নির্ধারণ ও আইনি স্বীকৃতি। আমাজনে ২৯টি অঞ্চল এখনো অপেক্ষায়।
গতকাল রবিবার কপ-৩০ এর সপ্তম দিনে ব্লু জোনের প্রবেশদ্বারে ‘পিপলস সামিট মার্চ’-এ শত শত অংশগ্রহণকারী সরকার-করপোরেট প্রভাবমুক্ত জলবায়ু সিদ্ধান্ত দাবি করেন। অভিযোগ, আমাজন রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বন উজাড়, অবৈধ খনন, জমি দখল, নদীদূষণ কমেনি। আদিবাসী জোট অচওই, আন্দিয়ান কাউন্সিল ও নদীনির্ভর সম্প্রদায় বলেন, তারা পরিবেশের প্রথম সারির রক্ষক; কিন্তু কপ-এ তাদের মতামত প্রান্তিক।
দাবি : জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের সময়সীমা, ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর, ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে সরাসরি প্রবেশ। ১ হাজার ৬০০- এর বেশি জীবাশ্ম লবিস্টের উপস্থিতিকে ‘করপোরেট অনুপ্রবেশ’ বলা হয়েছে। সেøাগানে মুখরিত : ‘আমাদের ভূমি, আমাদের অধিকার’, ‘আমাজন বাঁচাও’, ‘করপোরেট নয়, জনগণের কপ চাই’। প্রবেশপথে জট সৃষ্টি হলেও নাগরিক সমাজ মনে করে, আন্দোলন জনগণের উদ্বেগ সামনে এনেছে।
কপ শুরুর আগের সপ্তাহ থেকে শতাধিক আদিবাসী সম্প্রদায় কর্মসূচি চালাচ্ছে। ৬ নভেম্বর লুলাকে স্মারকলিপি, ভূমি স্বীকৃতি, তেল-গ্যাস স্থগিতের দাবি। ৭ নভেম্বর শোক মিছিল। ৮ নভেম্বর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। ৯ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘জলবায়ু রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু আদিবাসী স্বর উপেক্ষিত।’ ১০ নভেম্বর উদ্বোধনে ৩ হাজারের মিছিল : ‘আমাজন আমাদের ঘর, করপোরেট নয়।’ ১১ নভেম্বর নদীদূষণ-খনি বিরোধিতা। ১২ নভেম্বর অবস্থান ধর্মঘট। ১৩ নভেম্বর ৩ কিমি মানববন্ধন। ১৪ নভেম্বর ‘তেলমুক্ত আমাজন’। রাওনি বলেন, ‘আমরা জঙ্গলের শেষ রক্ষাকবচ। আমাদের ছাড়া আমাজন বাঁচানো অসম্ভব।’
