দেশের প্রায় প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৪ জনের রক্তেই ‘উদ্বেগজনক’ মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ শতাংশ এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় ৮ শতাংশের দেহে সিসার মাত্রা নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৬৫ শতাংশের বেশি এলাকা।
গতকাল রবিবার রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের যৌথ জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
ইউনিসেফ বলছে, সিসা দূষণ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে হুমকি সৃষ্টি করে এবং এর প্রভাব সব আর্থসামাজিক শ্রেণির ওপরই পড়ছে। আক্রান্ত শিশুদের অর্ধেকের বেশি ধনী এবং ৩০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বলেও জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়। প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এ জরিপে শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সুরক্ষা ও বিকাশে বিদ্যমান অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছে।
জাতীয় অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক মানদ-ের সঙ্গে সংগতি রেখে ১৭২টি মানদ- এবং ২৭টি এসডিজি সূচক তুলে এনেছে জরিপের মাধ্যমে।
জরিপের ফলাফল থেকে দেশের সব বিভাগ, জেলা এবং তিনটি সিটি করপোরেশন এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে, যা নীতিনির্ধারকদের বৈষম্যের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।
বেড়েছে শিশুশ্রমের হার : দেশে শিশুশ্রমের হারও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। ফলাফল বলছে, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার এখন ৯ দশমিক ২ শতাংশ; যা ২০১৯ সালের এই জরিপে ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ, শিশুশ্রমের হার ছয় বছরের মাথায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে; যার বেশি দেখা উত্তরাঞ্চলে। রাজশাহী বিভাগে শিশুশ্রমের হার ১২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং রংপুরে এর হার ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। এর ফলে দেশে ‘আরও ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিতে পড়েছে’ বলে তুলে ধরে ইউনিসেফ। সাম্প্রতিককালে ‘সিজারিয়ান সেকশনের’ হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেড়েছে সিজার : প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগের জরিপে যেখানে সিজারিয়ান সেকশনের হার ছিল ৯ শতাংশের মতো সেটি নতুন জরিপে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ শতাংশে। এখানে দেখা যায়, দরিদ্রের মধ্যে এ হার ৩৪ শতাংশ এবং ধনীদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ৭৫ শতাংশে প্রসবের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশনের হার বৃদ্ধি ‘স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক চাপ’ উভয়ই বাড়াচ্ছে বলে ইউনিসেফের ভাষ্য। তবে শিশুমৃত্যুর হার এবং বাল্যবিবাহের মতো সূচকে কিছুটা ইতিবাচক সাফল্যের দেখা মিলেছে জরিপে।
বাল্যবিবাহের হার ২০১৯ সালের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, তবে এখনো প্রায় অর্ধেক মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। এ ছাড়া নবজাতকের ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে মারা যায় ২২ জন, যা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর (৩৩ শিশু) ৬৭ শতাংশ। আগের জরিপে এ সংখ্যা ছিল ২৪।
চলতি বছরের শুরুতে জরিপের সময়ে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে সিলেটে (২৯) এবং ঢাকায় (২৫)। সবচেয়ে কম মিলেছে খুলনা (১৫) এবং ময়মনসিংহ (১৮) বিভাগে।
যে নারীর বয়স ১৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে তাদের প্রত্যেক শিশু জন্মদানের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জরিপের ফল ধরা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো শিশুর মৃত্যু হলে তা জন্মের কতদিনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে, সেই হিসাবটি আমলে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় স্বাস্থ্যসেবা এত উন্নত হওয়া সত্ত্বেও শিশুমৃত্যুর হার বেশি কেন এক চিকিৎসকের প্রশ্নের উত্তরে বিবিএস থেকে বলা হয়, জরিপের ফল আরও বিশ্লেষণ করলে এর উত্তর মিলবে। এখন যে তথ্য মিলেছে, সেটিই প্রাথমিক ফলাফলে তুলে ধরা হয়েছে।
ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, বাল্যবিবাহ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস প্রমাণ করে যে অগ্রগতি সম্ভব, কিন্তু সিসা-দূষণ এবং শিশুশ্রমের মতো সংকট লাখ লাখ শিশুকে তাদের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত করছে এবং বেড়ে চলা সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের হার নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। যখন প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকা, বিকশিত হওয়া ও শেখার অধিকারকে সম্মান করা হবে, তখন এটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশের মাধ্যমে পরিমাপ করা যাবে।
জরিপের এসব ফলাফল ধরে সরকারের নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এ তথ্যকে সুনির্দিষ্ট কাজে পরিণত করতে এবং কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে সেই লক্ষ্যে পরিবর্তন আনতে সরকারকে সহায়তা করতে ইউনিসেফ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
