২২ বছর পর ঢাকাতেই হলো ভারতবধ কাব্য

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:১৬ এএম

একটা জয়ের জন্য প্রায় ২৩ বছরের অপেক্ষা। জাতীয় স্টেডিয়ামে ২০০৩ সালে জানুয়ারির এক শীতের রাতে যে জয়টা শেষবারের জন্য ধরা দিয়েছিল, সেই স্মৃতি আবার ফিরে এলো সেই একই মাঠে। ভারতকে হারানোর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটল অবশেষে। প্রার্থিত জয়ের নায়ক শেখ মোরসালিন। ম্যাচের ১১ মিনিটে আক্রমণসঙ্গী রাকিব হোসেনের দারুণ অ্যাসিস্টে নিখুঁত ফিনিশ করেন এ ফরোয়ার্ড। এরপর সেই লিড ধরে রাখার দীর্ঘ সংগ্রাম। শেষমুহূর্তে পেয়ে বসেছিল গোল হজমের শঙ্কা। তবে এবার আর ভুল হয়নি। ভারতকে হতাশায় ডুবিয়ে বাংলাদেশ ভেসেছে জয়ের আনন্দে। এ নিয়ে চতুর্থবার ভারতকে হারাল বাংলাদেশ। ২৮ ম্যাচে যে ঐতিহাসিক দ্বৈরথ, তাতে অনেক দিন পর শেষ হাসি লাল-সবুজের সেনানীদের। তাই এ জয়ের উদযাপনটা যেন থামছিলই না। পুরো স্টেডিয়াম ঘুরে ঘুরে জয়পিপাসু সমর্থকদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিলেন হামজা, রাকিব, মোরসালিনরা।

একটি প্রজন্ম ফুটবল মাঠে ভারতকে হারাতে দেখেনি। প্রেস বক্সে উপস্থিত সাংবাদিকদের একটা বড় অংশের সে অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই জয়টা ছুঁয়ে গেছে মিডিয়াকর্মীদেরও। পেশাগত পরিচয় ভুলে তারাই উন্মাতাল হলেন, আবেগে কারও চোখে ছিল আনন্দ অশ্রু।

এমন একটা জয় যেন প্রাপ্যই ছিল বাংলাদেশের। লেস্টার সিটি তারকা হামজা চৌধুরী বাংলাদেশের হওয়ার পর থেকেই শুরু অপেক্ষার। গত আট মাসে জয়ের খুব কাছে গিয়েও হৃদয়ভাঙা আর্তনাদ সঙ্গী হয়েছে বারবার। চার দিন আগেও এ মাঠেই নেপালের কাছে শেষমুহূর্তে গোল খেয়ে নিশ্চিত হার মুঠো ফসকে যায়। এরপর থেকেই কু-ডাক ডাকছিল। নেপালকে হারাতে না পারা বাংলাদেশ কি পারবে জিততে তাদের থেকে র‌্যাংকিংয়ে ৪৭ ধাপ এগিয়ে থাকা ভারতের বিপক্ষে? এমনিতে টানা দুটি এশিয়ান কাপ খেলা ভারত দুই ম্যাচ বাকি থাকতেই বিদায় নিয়েছে। তলানিতে থেকে তারা এসেছিল প্রথম জয় ছুঁতে। তাই ম্যাচের আগেই জমজমাট এক লড়াইয়ের আভাস ছিল। হয়েছেও তাই। লিড বাঁচাতে বাংলাদেশের রক্ষণাত্মক কৌশলে চোখের আনন্দ শেষদিকে গায়েব হয়ে গিয়েছে ঠিক, তবে সে কৌশলেই এবার সফল বাংলাদেশ। রক্ষণ নড়বড়ে হয়েছে বারবার, শিশুতোষ ভুল করেনি। শুরুতে নার্ভাস গোলকিপার মিতুল মারমাও চাপ সামলে শক্ত প্রতিরোধ গড়েছেন। আর মাঠে একজন লড়াকু হামজা থাকলে তো কথাই নেই। পুরোটা সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। এসবের যোগফলে মিলেছে কাক্সিক্ষত জয়।

নেপালের ম্যাচের একাদশে দুটি পরিবর্তন এনে ভারতের বিপক্ষে শুরুর রণকৌশল সাজিয়েছিলেন বাংলাদেশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা। সোহেল রানা জুনিয়রের জায়গায় একাদশে আসেন শমিত সোম। আর জামাল ভূঁইয়ার জায়গায় চোটের কারণে আগের ম্যাচ মিস করা মোরসালিন। নেপালের ম্যাচে জোড়া গোল হজমে ভূমিকা রাখা গোলকিপার মিতুল মারমাকে এ ম্যাচেও খেলিয়েছেন কোচ। স্টপার ব্যাক পজিশনে যথারীতি তপু বর্মণ ও তারিক কাজী শুরু করেছিলেন। রাইটব্যাক পজিশনে সাদউদ্দিন এবং লেফটব্যাকে খেলেন জায়ান আহমেদ। হামজা, সোহেল রানা সিনিয়র কিছুটা নিচে নেমে খেলেছেন। শমিত খেলেন ১০ নম্বর পজিশনে। বাঁদিকে ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, নাম্বার নাইনে মোরসালিন ও নিজের প্রিয় রাইট উইং পজিশনে খেলেন রাকিব। তাতেই ভারত অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে প্রথমার্ধে।

ম্যাচের ১১ মিনিটে রাকিবের গতি আর মোরসালিনের ক্লিনিক্যাল ফিনিশে লিড নেয় বাংলাদেশ। নিজেদের অর্ধে রাকিবকে থ্রু বাড়িয়েছিলেন মোরসালিন নিজেই। রাকিব সে বল নিয়ে মার্কার আকাশ মিশ্রকে গতিতে পরাস্ত করে বাঁদিক দিয়ে বক্সে ঢুকে আড়াআড়ি পাস বাড়ান। দৌড়ে এসে মোরসালিন ভারত কিপার গুরপ্রিত সিং সান্ধুর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে আলতো টোকায় বল জালে জড়িয়ে বুনো উল্লাসে মাতেন। বাংলাদেশের জার্সিতে মোরসালিনের এটা সপ্তম গোল। ম্যাচের ২৭ মিনিটে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন তারিক কাজী। তপুর বর্মণের সঙ্গে সেন্টার ব্যাকের দায়িত্বে যান শাকিল আহাদ তপু। এই তরুণ তারিকের অভাব বুঝতে দেননি বাকি সময়টায়।

ম্যাচের ৩১ মিনিটে মিতুল মারমার ভুলে গোল হজম করতে পারত বাংলাদেশ। তবে অসাধারণ সেভে সে যাত্রায় বাংলাদেশকে রক্ষা করেন হামজা। মিতুল গোলকিকে লো বিল্ডআপ করতে গিয়ে গড়বড় করে ফেলেন। বল পেয়ে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে লালিয়ান জুয়ালা চাংতে বাঁ পায়ে শটে চেয়েছিলেন বল অরক্ষিত পোস্টে পৌঁছে দিতে। হামজা হেড করে কর্নারের বিনিময়ে সে চেষ্টা নস্যাৎ করে দেন।

এরপরই খানিকটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে মাঠে। শোল্ডার চ্যালেঞ্জের পর থ্রো করতে যাওয়া বিক্রম প্রতাপের কাছ থেকে বল কেড়ে নিতে গিয়েছিলেন তপু বর্মণ। সংঘর্ষে বিক্রম মাটিতে পড়ে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ঘটে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা। জটলার মধ্যে মোরসালিনকে ধাক্কা মেরে বসেন নিখিল প্রভু। পরে তাই তপু ও নিখিলকে হলুদ কার্ড দেখান ফিলিপাইনের রেফারি। ম্যাচের ৪৪ মিনিটে গোলের সুযোগ এসেছিল হামজার সামনে। বক্সের ঠিক বাইরে থেকে আগের ম্যাচে জোড়া গোল করা মিডফিল্ডারের জোরালো ভলি অবশ্য লক্ষ্যে থাকেনি।

বিরতির পর থেকেই বাংলাদেশ হয়ে পড়ে অতি রক্ষণাত্মক, যা সুযোগ করে দেয় ভারতকে। খোলস ছেড়ে বের হয়ে তারা আক্রমণ শানিয়েছে পুরো সময়টা। ম্যাচের ৪৯ মিনিটে সুরেশ সিংয়ের ফ্রি-কিকে রাহুল ভেকের হেড বার ঘেঁষে বাইরে যায়। এর চার মিনিট পর মহেশ সিংয়ের ডান পায়ের ভলি বাইরে গেলে বেঁচে যায় বাংলাদেশ। এরপর থেকে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ভারতের কাছে। তবে হামজা, মিতুল, তপু, সাদরা বারবার তাদের আক্রমণগুলো ভেস্তে দিয়েছেন। ৭৯ মিনিটে ব্যবধান বাড়তে পারত। একক প্রচেষ্টায় মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে আক্রমণে ওঠেন শাকিল আহাদ তপু। বক্সের ঠিক বাইরে তার জোরালো শট কোনোমতে রুখে দেন ভারত কিপার গুরপ্রিত সিং। দুই মিনিট পর ডানদিক থেকে শাহরিয়ার ইমনের ক্রসে ফাহিমের হেড সন্দেশ ঝিঙ্গানের হাতে লেগে বাইরে যায়। রেফারি পেনাল্টি না দিয়ে কর্নার দেন। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল নিয়ে আক্রমণে উঠছিলেন ব্রাইসন। তপু দারুণ ট্যাকলে বিপদমুক্ত করেন।

অতিরিক্ত সময় ছিল ছয় মিনিটের। সে সময়টায় গোল খাওয়ার ভীতি পেয়ে বসেছিল। তবে ভারত পারেনি আক্রমণগুলোকে গোলে রূপ দিতে। তাতেই ২০০৩-এর শীতের রাতের স্মৃতি ফিরেছে ঢাকায়। এ জয়ে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের গ্রুপ পর্ব তিনে শেষ করা অনেকটাই নিশ্চিত বাংলাদেশের। টপ ফেভারিট হয়েও তলানিতে শেষের শঙ্কায় ভারত এতটাই হতাশ, প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত না মিলিয়েই মাঠ ছাড়ে।

বাংলাদেশ একাদশ: মিতুল মারমা, তপু বর্মণ, তারিক কাজী (শাকিল আহাদ তপু), জায়ান আহমেদ (তাজউদ্দিন), সাদউদ্দিন, হামজা চৌধুরী, সোহেল রানা, শমিত সোম, শেখ মোরসালিন (শাহরিয়ার ইমন), রাকিব হোসেন ও ফয়সাল আহমেদ ফাহিম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত