দীর্ঘদিন ধরে মানবসেবায় নিয়োজিত আছেন মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি মিরপুর রূপনগর জামিয়া আশরাফিয়ার প্রিন্সিপাল-শায়খুল হাদিস, খতিব, লেখক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী। স্বপ্ন দেখেন সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের। কওমি শিক্ষাকার্যক্রম, সমাজব্যবস্থা ও মানবসেবার বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান আল মামুন
দেশ রূপান্তর : দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদ্রাসার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু সংযোজন বিয়োজনের বিষয়ে কথা হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে সিলেবাস সংযোজন, সরকারি সনদের বাস্তবায়ন উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম : কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক ও বাস্তবমুখী বিষয় যুক্ত করা নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। এটি স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কম্পিউটার, গণিত, ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের মতো আধুনিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়গুলো প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরও বিস্তৃত পরিসরে এগুলো যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের সমসাময়িক যুগ চাহিদার প্রেক্ষিতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী যোগ্য করে গড়ে তোলাই লক্ষ্য। কিন্তু এই পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন নিয়ে কওমি মাদ্রাসা এবং বাইরের শিক্ষাবিদদের মধ্যে ভিন্ন মত দেখা যায়। সিলেবাসের বিষয়টি অতি সংবেদনশীল। তারপর এটি বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয়। শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা কিংবা নিছক পর্যালোচনামূলক কথাবার্তা এক্ষেত্রে মোটেই ফলদায়ক নয়। তাই যুগ চাহিদার প্রেক্ষিতে আধুনিক সিলেবাস সংযোজন করার আগে আরও যাচাই-বাছাই জরুরি। কারণ কওমি ধারার এই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই বর্তমান পৃথিবীতে খাঁটি ইসলাম টিকে আছে। তাই কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিকায়ন সংস্কার মূল উদ্দেশে ব্যাঘাত ঘটায় কি না, তা আরও সতর্কতার সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রিকেট খেলার আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম : বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে খেলাধুলা শারীরিক বিকাশের জন্য খুবই জরুরি, তা স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসা যেখানেই হোক। তবে খেলাধুলার জন্য ইসলামি শরিয়তে কিছু বিধান রয়েছে। যা অনুসরণ করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। ইসলামে খেলাধুলা বৈধ হওয়ার জন্য ৪টি শর্ত রয়েছে। এক. খেলার মাধ্যমে ইসলামের কোনো বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না। দুই. অর্থনৈতিক অপচয় যাবে না। তিন. খেলাটি অংশগ্রহণকারী ও দর্শকদের পেশা ও নেশা হওয়া যাবে না। চার. খেলার মাধ্যমে শারীরিক ব্যয়াম হতে হবে। এই ৪টি শর্ত কোনো খেলাধুলায় পাওয়া গেলে ইসলামি শরিয়ত সেগুলোকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়।
দেশ রূপান্তর : আপনি যুল জালালি ওয়াল ইকরাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জনসেবায় নিয়োজিত আছেন। এই সংগঠন সম্পর্কে বলুন।
মুফতি মুহাম্মদ সিরাজল ইসলাম : যুল জালালি ওয়াল ইকরাম ফাউন্ডেশন একটি অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এর স্লোগান হলো, ‘মানুষের প্রয়োজনে মানুষের কল্যাণে মানুষের পাশে আমরা, মৌলিক অধিকার বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসায়’। আমাদের দেশের মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার কতটুকু পাচ্ছে, কতটুকু থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? কতটুকু অধিকার রাষ্ট্র বা সরকার পূরণ করতে পেরেছে? বিজ্ঞানের এই উন্নতির যুগে এখনো আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের অভাব। আর এই ৩টি প্রধান মৌলিক অধিকার যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবেই মা-বাবা বাধ্য হয়ে শিশুকে শিক্ষা থেকে সরিয়ে শ্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু কি তাই? ‘দ্য কোয়ালিটি স্টাডি অন চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ ২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। এখন তাদের মা-বাবা আছে কি নেই, তারা নিজেরাও সে কথা জানে না। ফলে সে কীভাবে জানবে তার মৌলিক অধিকারের কথা? যে শিশুর নেই কোনো বাসস্থান, নেই দুবেলা দুমুঠো খাবারের ব্যবস্থা, ঝুপরি ঘর কিংবা রাজপথই যাদের স্থায়ী ঠিকানা। জীর্ণশীর্ণ, ছেঁড়া-ফাঁড়া ও নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত জামা পরে যারা লজ্জা নিবারণ করে, তারা কী করে জানবে তাদের মৌলিক অধিকার কী? যারা ক্ষুধার জ্বালায় ডাস্টবিনে কুড়িয়ে কিংবা কুকুরের মুখ থেকে খাবার কেড়ে খায়, ওই শিশু কি কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাবে পড়ালেখা শিখতে? উত্তর আমরা সবাই জানি। তবুও আমরা সবাই নিশ্চুপ। সুতরাং যে শিশু খাদ্য পায়নি, সে কি বস্ত্রের পেছনে দৌড়াবে? যে শিশু বস্ত্র পায়নি, সে কি বাসস্থানের পেছনে দৌড়াবে? আর যে শিশু বাসস্থান পায়নি, সে কি শিক্ষার পেছনে দৌড়াবে? আর যে শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত, সে কি চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা রাখে? তাই সবার আগে খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তারপর ধারাবাহিকভাবে বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্য সব কিছুর অভাব পূরণ করা বাঞ্ছনীয়। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যেদিন থেকে আমাদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের অভাব দূর হবে, সেদিন থেকে আমাদের শিক্ষার হার হবে শতভাগ। আর তারই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাবে আমাদের চিকিৎসাসহ অন্য সব অধিকার। এসব ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতেই ছুটে চলছি আমরা।
আমাদের যুল জালালি ওয়াল ইকরাম ফাউন্ডেশন নবীজি (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা অবহেলিত মানুষের সেবা, খাদ্যহীনের খাদ্যের ব্যবস্থা, বস্ত্রহীনের বস্ত্রের ব্যবস্থা, বাসস্থানহীন মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা, শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার ব্রত নিয়ে আরও এগিয়ে যেতে চাই। সর্বোপরি একটি আদর্শ ও শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালানোই আমাদের কাজ। এ ছাড়া আমরা বেকারত্ব দূরীকরণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে হস্তশিল্প, যন্ত্রশিল্প, কারিগরি, মৎস্যখামার, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খামারসহ নানাবিদ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলি।
দেশ রূপান্তর : আপনার বেশ কয়েকটি বই পাঠক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। আপনার সার্বিক লেখালেখি নিয়ে জানতে চাই।
মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম : ইসলামের প্রচার-প্রসারই আমার লেখালেখির মূলমন্ত্র। বিশেষ করে মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেসব বিধিবিধান পালন করে, নবীজি (সা.)-এর জীবনী, কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত শিক্ষণীয় নানা ঘটনাসহ ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলি আমার লেখালেখির প্রধান বিষয়। ‘হাদিসের বিরল কাহিনী’, ‘কুরআনের দুর্লভ গল্প’, ‘বুনইয়ানে ইসলাম’, ‘মানুষ কেন শ্রেষ্ঠ?’, ‘সিরাতের অন্তরালে’, ‘প্রিয় নবীর সুরভিত সম্ভাষণ’, ‘রণাঙ্গনের মহানায়ক’, ‘মু’মিনের পথ ও পাথেয়’, ‘অনন্ত কালের মুসাফির’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে পাঠকরা খুব উপকৃত হচ্ছেন।
দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশে এখনো কোরআন অবমাননার মতো ঘটনা ঘটছে। এর আগেও নানাভাবে ধর্মীয় অবমাননার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে জনগণ ও সরকারের করণীয় কী বলে মনে করেন?
মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম : আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ দেশে ইসলামবিদ্বেষী একটি চক্র ধর্মীয় উসকানি দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও ভক্তির জায়গায় বারবার আঘাত হানছে। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং উসকানিদাতাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। এসব অপরাধ নির্মূলে প্রয়োজনে আরও কঠোর আইন তৈরি করতে হবে। এ বিষয়ে সাধারণ জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করে সরকারকে তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে এবং কোরআন অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে দাবি জানাবে।
দেশ রূপান্তর : মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে উপদেশমূলক কিছু বলুন।
মুফতি মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম : মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য উপদেশ হলো, তারা যেন নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলে। যোগ্যতাই সফলতার চাবিকাঠি। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কদর করা, যোগ্য ওস্তাদের সাহচার্য গ্রহণ করা, উপযুক্ত গুরুজনের সান্নিধ্য লাভ করা। কথায় আছে, ‘সৎ সঙ্গ সর্গবাস, অসৎ সঙ্গ সর্বনাশ’। জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় করে একজন সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।
