বিনিয়োগে সব সুবিধা বিদেশিদের। লাভজনক খাত চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগে ইতিমধ্যে তিন বিদেশি কোম্পানি তিনটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। পাইপলাইনে রয়েছে আরও তিন কোম্পানি। এসব বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগের পর ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধাও পাবে। বিদেশিদের জন্য এত সুবিধা থাকলেও দেশের ব্যবসায়ীরা উপেক্ষিত থাকছেন বলে দাবি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা চেয়েছেন একই সুবিধা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান গত বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে ডেনমার্কের কোম্পানি এবং পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনায় সুইজারল্যান্ডের যে কোম্পানি চুক্তি করেছে, তারা ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধা পাবে। এনবিআর চেয়ারম্যানের এ বক্তব্যের বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব (কর তথ্য ব্যবস্থাপনা ও মূল্যায়ন) মো. জাফর ইমামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০ বছরের করমুক্ত সুবিধা এবারই প্রথম নয়। প্রায় সাত-আট বছর আগে (২০১৭ সালে) বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) আইনের অধীনে বিশেষ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য এই করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।’
তবে এ সুবিধা পেতে কিছু শর্ত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইপিজেড, বেজা, সড়ক, রেল, বন্দরসহ প্রায় ১২ টি ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে কিছু শর্ত আছে। এসব শর্ত পূরণ করলে করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়।’ এ সুবিধা কি নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি কিংবা নির্মাণ উপকরণেও পাওয়া যাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে জাফর ইমাম বলেন, ‘ইকুইপমেন্ট কিংবা অবকাঠামো নির্মাণে কোনো ভ্যাট বা শুল্ক ছাড় নেই। শুধু আয়ের ওপর কর মওকুফ করা হয়। এখন যেহেতু বন্দরে দুই বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তারা শর্ত পূরণ করলে এ সুবিধা পাবে। ইতিমধ্যে দেশের ইপিজেড ও বেজায় যেসব বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে, তারা এ সুবিধা পাচ্ছে।’
এদিকে বিদেশি কোম্পানি যদি বিনিয়োগের জন্য সুবিধা পায়, তাহলে দেশীয় কোম্পানিগুলো কেন পাবে না এমন প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় কোম্পানিগুলোকেও এসব সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। এতে দেশে ব্যবসার প্রসার ঘটবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফ (গত ৯ নভেম্বর উচ্চ আদালতের আদেশে এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে) নিয়ে ব্যবসায়ীরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তা থেকে মুক্তি দিতে হবে।’
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিশ্বের সব দেশেই কিছু প্রণোদনা দেওয়া হয় বলে জানান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মঈনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বন্দরে বিনিয়োগের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে ১০ বছরের কর মওকুফ সুবিধা দেওয়া দোষের কিছু নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই এমন সুবিধা দেওয়া হয়।’
তিন টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি তিন কোম্পানি : ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার জন্য সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের সঙ্গে ২২ বছরের চুক্তি করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। পরবর্তীকালে গত সোমবার পতেঙ্গায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ৪৮ বছরের (তিন বছর নির্মাণকাল, ৩০ বছর পরিচালনা, চুক্তি শেষে আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ডেনমার্কের এপি মোলার-মায়ের্সক কোম্পানি। একই দিনে নারায়ণগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য চুক্তি করেছে সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)।
আসছে আরও তিন বিদেশি কোম্পানি : চট্টগ্রাম বন্দরের আগামীর বন্দর হিসেবেখ্যাত বে টার্মিনালের তিনটি টার্মিনালের মধ্যে দুটি কনটেইনার টার্মিনালের একটি নির্মাণ করবে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল এবং অন্যটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড; এ ব্যাপারে জিটুজি চুক্তি হয়েছে। মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ নির্মাণ করার কথা থাকলেও এখানেও জিটুজি ভিত্তিতে বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিসেম্বর পর্যন্ত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড (বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান) পরিচালনা করছে। ডিসেম্বরের পর এটি বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার কথা থাকলেও গতকাল হাইকোর্ট এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার চলমান প্রক্রিয়া মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে।
ল্যান্ডলর্ড মডেলেই আসছে বিদেশিরা : চট্টগ্রাম বন্দর একসময় সার্ভিস পোর্ট ছিল উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, বর্তমানে বে টার্মিনাল ও লালদিয়ায় যে মডেলে বিদেশি কোম্পানিরা বিনিয়োগ করছে, তা ল্যান্ডলর্ড মডেল। এ মডেলে শুধু জমির মালিক থাকবে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ আর টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করবে বেসরকারি কোম্পানি। যে বন্দরের সব খরচ ও আয় সরকার বহন করে তাকে সার্ভিস পোর্ট বলা হয়। বর্তমানে মোংলা ও পায়রা বন্দর সার্ভিস পোর্ট। চট্টগ্রাম বন্দরও একসময় সার্ভিস পোর্ট ছিল। ১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯১ সালে জেটিতে ক্রেন সংযোজন, ২০০৭ সালে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে টুলস পোর্টে প্রবেশ করে। তখন থেকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন করে আসছে। সর্বশেষ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য অধিগ্রহণকৃত ভূমির মূল্য এবং বে টার্মিনালের ভূমি অধিগ্রহণের খরচও বন্দরের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে। টুলস পোর্ট হিসেবে অবস্থান মজবুত করার পর এখন বিশ্বের আধুনিক বন্দরগুলোর মতো ল্যান্ডলর্ড পদ্ধতিতে প্রবেশ করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। এ পদ্ধতিতে কর্র্তৃপক্ষ শুধু ভূমি ও লজিস্টিক সহায়তা দেবে, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করবে এবং চুক্তি অনুযায়ী বন্দর কর্র্তৃপক্ষকে রাজস্ব দেবে। চট্টগ্রাম বন্দর এখন পুরোদমে এই ল্যান্ডলর্ড মডেলে প্রবেশ করেছে।
