একজন সত্যিকারের জনদরদি মানুষ

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৫ এএম

মওলানা আবদুল হামিদ খান একজন কিংবদন্তি রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলার কৃষকদের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি নিজে ছিলেন কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই তাদের দুঃখ-দুর্দশা, সংকট-সম্ভাবনা বুঝতেন গভীরভাবে। অবর্ণনীয় দুর্দশায় পতিত কৃষক সমাজের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি নিঃসংকোচে। কৃষকদের পক্ষ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অংশ হিসেবে আসামের ভাসান চরে বিশাল এক কৃষক সমাবেশে উপস্থিত কৃষক সমাজ তাকে উপাধি দেয় ‘ভাসানী’। এই সম্মানসূচক উপাধি একসময় তার নামে পরিণত হয়। সেই থেকে ভাসানী বা মওলানা ভাসানী নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। সারাজীবন নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে তিনি মজলুম জননেতা হিসেবেও পরিচিত। সারাজীবন স্বপ্ন দেখেছেন বৈষম্যহীন একটি সমাজের, যেখানে সাম্য, সম্প্রীতি আর মেলবন্ধন রচিত হবে। এ কারণে তিনি চিহ্নিত হয়েছেন রেড মওলানা বা লাল মওলানা হিসেবেও। তবে ভাসান চরের অকৃত্রিম হৃদয়ের অধিকারী কৃষকদের দেওয়া উপাধি ‘ভাসানী’ বা ‘মওলানা ভাসানী’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত।

আবদুল হামিদ খান জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। তার বাবার নাম শরাফত আলী খান ও মায়ের নাম মজিরন নেসা বিবি। ছোটবেলায় সবাই তাকে ডাকতেন চেগা মিয়া নামে। তিন ভাই, এক বোনের বিশাল পরিবার ছিল তাদের। অল্প বয়সেই মা-বাবা, ভাইবোন সবাইকে হারান হামিদ। অনাথ হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন পীর শাহ নাসিরউদ্দিন শাহ বোগদাদীর। এই সংকটময় সময়ে তার জীবনে ময়মনসিংহের একটি মক্তবে ভর্তি হন। এরপর তার অভিভাবক, পীরের চেষ্টা ও সহযোগিতায় ভারতের আসামে পড়াশোনা করতে যান। সেখানে কৃষকদের দুরবস্থা দেখে প্রতিবাদ করেন, যুক্ত হন কৃষক আন্দোলনে। জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের এই আন্দোলন তাকে রাজনীতির মঞ্চে নিয়ে আসে। ঐতিহাসিক এই সমাবেশে তাকে ভাসানী উপাধি দেয় সাধারণ কৃষকরা। এরপর থেকে তার নামের শেষে ভাসানী নাম যুক্ত হতে থাকে।

ছোটবেলা থেকে জাত-পাতের ভেদাভেদ পছন্দ করতেন না আবদুল হামিদ খান। তারা ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের। আশরাফ শ্রেণির। সামাজিক দাওয়াতের অনুষ্ঠানে তাদের স্থান ছিল ভিন্ন এবং সম্মানের। কিন্তু ভাসানীর এই ব্যবস্থা পছন্দ হতো না। এক সামাজিক অনুষ্ঠানে চেগা মিয়া ও তার চাচাকে উঁচু জাতের মানুষের সঙ্গে ভালো আসনে বসতে দেওয়া হলো। তিনি তখন তার এক বন্ধুকে ডেকে পাশে বসিয়ে এক সঙ্গে খাওয়া দাওয়া শুরু করলেন। এটি তার চাচার কাছে ভালো লাগল না। তিনি হামিদকে বকাঝকা শুরু করলেন, কেন সাধারণ একটি ছেলেকে ভদ্রজনের সঙ্গে বসালো। চাচার এই আচরণ তার ভালো লাগল না। তিনি চাচার বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, একজন মানুষ আরেকজন মানুষের থেকে ছোটবড় হয় কীভাবে? তিনি সেই ছোটবেলাতেই যেটি ঠিক বলে ভেবেছিলেন, তা সারাজীবন মেনে চলেছেন। মানুষে মানুষে বিভেদ করেননি আজীবন। তিনি কৃষকদের মাঝেও জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ বিভেদে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন, ‘ভারতের কৃষকের দুঃখ, ইরানের কৃষকের দুঃখ, বার্মার কৃষকের দুঃখ, নেপালের কৃষকের দুঃখ, ভুটানের কৃষকের দুঃখ, কাবুলের কৃষকের দুঃখ, বাংলাদেশের কৃষকের দুঃখ-এক দুঃখ...।’

রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সম্মুখ সংগ্রামের পক্ষে, গুপ্ত রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করো। জুলুমকে রুখিয়া দাঁড়াও, যদি কাহাকেও শাসাইতে হয় তাহার সম্মুখে বীরের মতো বলো। ভীরু কাপুরুষের মতো অজ্ঞাতে কিছু বলিও না।’ তিনি সারাজীবন সামনে থেকে

কৃষকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জমিদাররা এটা পছন্দ করত না। তারা কৃষকদের একতাবদ্ধ হতে দেখে শঙ্কিত হয়ে ইংরেজ সরকারকে জানিয়ে দেয় এবং ভাসানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করে। কারণ তারা বুঝেছিল, ভাসানী যদি কৃষকদের সংগঠিত করতে পারেন তাহলে উত্তেজিত কৃষকরা জমিদারদের আদেশ নিষেধ মানবে না এবং তাদের ওপর আক্রমণও হতে পারে। ইংরেজ সরকার ভাসানীকে প্রতিরোধ করতে তাকে আন্দোলনের অঞ্চল থেকে বহিষ্কার করেন। একাধিকবার। একবার ময়মনসিংহ থেকে, আরেকবার গোটা বাংলা থেকে। বাংলা থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরে আবদুল হামিদ খান আসামে চলে যান।

রাজনীতির পথে চলতে আবদুল হামিদ খান অনেক বড় নেতার সংস্পর্শে এসেছেন। কারও কাছ থেকে শিক্ষক হিসেবে পাঠ নিয়েছেন রাজনীতির, আবার কারও সঙ্গে জোট বেঁধে চলেছেন পথ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে তিনি অনুসরণ করতেন। তিনি ছিলেন তার রাজনৈতিক গুরু। তার মৃত্যুতে তিনি ভীষণ ভেঙে পড়েন। এমনকি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাও করেছিলেন। পরে মানুষের দুর্দশা দেখে আবার প্রতিবাদে উচ্চকিত হয়ে ওঠেন। তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুরের জমিদারের অত্যাচার বন্ধের জন্য অনশন শুরু করেন। সাতদিন চলে সেই অনশন। অনশনের কথা শুনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ছুটে আসেন। তাদের অনুরোধে তিনি অনশন ভাঙেন।

ভাসান চরে থাকতেই তিনি মুসলিম লীগে যুক্ত হন। কিন্তু সে সময় মুসলিম লীগ ছিল অভিজাত শ্রেণির করায়ত্ত। তার নেতৃত্বে অভিজাত শ্রেণির মানুষের হাত থেকে রাজনীতিক নেতৃত্ব আসে সাধারণ মানুষের হাতে। তিনি প্রাদেশিক নির্বাচনে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তার লাগতার আন্দোলনের ফলে এক গণভোট হয়। সে ভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিলেটকে পূর্ববাংলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে করে গঠন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার পরে ভাসানী মুসলিম লীগের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন। তাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদে ভাসানী অনশন করেন। বাধ্য হয়ে সরকার তাকে মুক্তি দেয়। এদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করেন।

১৯৫৪ সালে তিনি ২১ দফার ভিত্তিতে গঠিত যুক্তফ্রন্ট সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলার সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট নেতা হিসেবে যুক্ত হন। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২২৮টি আসনে জয়ী হয়। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠনের এক মাসে মাথায় পূর্ববাংলা প্রাদেশিক সরকারকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেয়। ভাসানী তখন স্টকহোমে ছিলেন। দেশে ফিরলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইস্কান্দার মির্জা। ১৯৫৪ সালের ২৮ মে থেকে ডিসেম্বর তিনি ইউরোপে জনমত গঠনে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই শান্তি আর সৃষ্টি। এই হচ্ছে আমার ইসলামের মূল শিক্ষা।’ তিনি বলেন, স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাসানী কলকাতা হয়ে দেশে ফেরেন। তিনি পল্টন ময়দানে জনসভা করে ২১ দফা দাবি প্রণয়ন করে তার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র তৈরির দাবি জানান। ততদিনে আওয়ামী মুসলিম লীগ তাদের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি ত্যাগ করেছে। ১৯৫৭ সালে রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন এবং ন্যাপ গঠন করেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা সমর্থন করেন এবং ১৯৬৯ আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। এর ফলে সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালের ৯ ডিসেম্বর ন্যাপ বিলুপ্ত করে শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনে সহযোগিতা করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বিবৃতি দেন। জাতিসংঘ, চীন ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাহায্য কামনা করেন। মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের পরেও তিনি সরকারের সমালোচনা করে সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। এজন্য তাকে গৃহবন্দি হতে হয়। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে ফারাক্কা অভিযানের ডাক দেন। এপ্রিল থেকে তার শরীর ভেঙে পড়ে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাত ৮টা ২০ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৯ নম্বর কেবিনে এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন।

মওলানা ভাসানী ছিলেন তৃণমূলের জনগণের নেতা। তিনি ছিলেন ভূমিপুত্র। তিনি তৃণমূলের মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। এ কারণে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মে তার প্রভাব ছিল তুলনারহিত। তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র দশ বছরের মধ্যেই তিনি বুঝে ফেলেন যে, সমতা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক সমাজের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কোনো মনোযোগ নেই। তারা

কৃষকদের দুর্দশা দূরীকরণে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সে জন্য পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন ‘ওয়ালাইকুমাসসালাম’ বলে।

তার জীবন সংগ্রাম মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত