অন্তর্বর্তী সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ফ্যাসিস্ট বা গণতন্ত্রপন্থি, সামরিক অথবা জোট সরকার কতজন ক্ষমতায় এলো-গেল, কিন্তু মশক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সফলতা কেউ দেখাতে পারেনি। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত বা সরকারের আদেশে আসা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর কর্তারাও এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। যার ফলে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু এখন সারা দেশের বছরব্যাপী ব্যধিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, ডেঙ্গু এক সময় বর্ষাকালীন রোগ ছিল। এটি ঢাকা ও বড় শহর ছাড়া তেমন ছড়াত না। কিন্তু এই ডেঙ্গু এখন ১২ মাস ভোগাচ্ছে। ছড়িয়েছে সারা দেশে। এ বছর উপকূলীয় জেলাগুলোতেও আশঙ্কাজনক হারে ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছে। যদি সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যেত তাহলে প্রাণঘাতী এই রোগ এত বিস্তার ঘটত না। তাছাড়া দেশে ডেঙ্গু বিস্তারে জলবায়ু পরিবর্তনের কিছুটা প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিকল্পনাবিদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মশক নিধনে কেউ সফল হয়েছেন বলে জানা নেই। মশক নিধন নিয়ে প্রায় সব এলাকার নাগরিকরাই অসন্তুষ্ট।
সারা দেশে ছড়াল যেভাবে : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, দেশে ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু জ¦র সম্পর্কে রিপোর্ট করা হয়েছিল, যা ‘ঢাকা জ¦র’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এরপর ১৯৭৭-৭৮ সালে কিছু বিচ্ছিন্ন রোগী শনাক্ত হয়। ১৯৯৬-৯৭ সালে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। ২০০০ সালে ডেঙ্গু এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার পুনরায় আবির্ভূত হয়। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজার জন হাসপাতালে ভর্তি হয়, যা রেকর্ডকৃত প্রথম বড় প্রাদুর্ভাব।
দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের রেকর্ডকৃত সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটে ২০১৯ সালে। সে সময়ে এক লাখ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় দেশের অন্যান্য স্থানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কম ছিল। ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহর ছিল এর কেন্দ্রস্থল। ২০২২ সালে দেশের ৬২টি জেলা থেকে কেস রিপোর্ট করা হয়েছিল। এ ছাড়া ডেঙ্গু কেসের ঋতুগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অক্টোবরে সর্বাধিকসংখ্যক কেস শনাক্ত করা হয়েছিল এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ অব্যাহত ছিল।
২০২৩ সালের ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আক্রান্ত এবং মৃত্যু উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ববর্তী সব প্রাদুর্ভাবকে ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যার মধ্যে ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যায়। ওই বছর দেশে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর সংখ্যা ঢাকা মহানগরীর রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। ঢাকায় রোগী ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন। ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন।
২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ঢাকাসহ সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৮ হাজার ২৯১ জন। সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার রোগীর সংখ্যা ৬২ হাজার ৯২৩ জন।
ওই বছর ডেঙ্গুতে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৪৪ এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ২৩১ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৫ সাল অর্থাৎ চলতি বছরের ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত এ রোগে ৮৬ হাজার ৯২৪ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং ৩৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৫ হাজার ৯৫৩ জন এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৬০ হাজার ৯৭১ জন আক্রান্ত হয়। মৃতদের মধ্যে ২২০ জন সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ১২৩ জন সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার।
ডেঙ্গুর মৌসুম পরিবর্তন : ২০২২-২৩ সালে ডেঙ্গু সংক্রমণের মৌসুম পরিবর্তিত হয়ে জুলাই-আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত পৌঁছায়। এ ছাড়া একটা বড়সংখ্যক রোগী নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসেও পাওয়া যায়। এর পেছনে বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক সময় সারা বছরই ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এখন এটি আর কোনো মৌসুমি রোগ নয়, বছরব্যাপী ভয়াবহতা ছড়াচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসেও ৯ হাজার ৭৪৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ৮৭ জন। নভেম্বর মাসে ২৯ হাজার ৬৫২ জন আক্রান্ত হয়েছিল এবং মারা গিয়েছিল ১৭৩ জন। চলতি ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম ১৮ দিনে ১৭ হাজার ৬২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে ৬৫ জন।
ওপরের দুটি পরিসংখ্যান থেকে স্পস্ট ডেঙ্গু এক সময় ঢাকাকেন্দ্রিক এবং মৌসুমি রোগ ছিল। কিন্তু এর বাহক এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করতে না পারার কারণে দেশব্যাপী ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে শীতকালেও এর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও ডেঙ্গুকে এক সময় বর্ষার রোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হতো।
হাজার কোটি টাকা জলে : ঢাকায় মশা মারতে ২০২৩ সালে ১১১ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে ১৫৪ কোটি টাকা এবং চলতি বছর ২০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত ১৩ বছরে মশার পেছনে ১ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে শুধু ঢাকাতেই।
শুধু ঢাকাই নয়, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে মশা মারার জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়। তাছাড়া ২২৯টি পৌরসভা এবং উপজেলা পর্যায়ে মশক নিধনে বরাদ্দ থাকে। এভাবে সব সরকারের আমলে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে মশার পেছনে। কিন্তু হাজার কোটি টাকায়ও মশার সঙ্গে পেরে উঠছে না কেউ।
সরকার-সংশ্লিষ্টরা বরাবরই বলে আসছেন জনসচেতনতা ছাড়া মশার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর মশক নিধন কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মশক নিধনে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’-এর মাধ্যমে অনেকেই সফলতা পেয়েছে। আমাদের দেশের মেয়ররা যদি ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্টের চারটি ধাপ পুরোপুরি ফলো করেন, তাহলে সফলতা পাবেন। ‘পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জীবজ নিয়ন্ত্রণ, কেমিক্যাল বা ওষুধ প্রয়োগ এবং জনসম্পৃক্ততা’ যেকোনো একটি বাদ দিলে সফলতা আসার কথা নয়।
তিনি বলেন, এগুলো আমাদের দেশে পুরোপুরি কেউ অনুসরণ করে না। আংশিক কাজ দিয়ে মশক নিধন সম্ভব নয়। যে কারণে মেয়র আসে মেয়র যায়, প্রতিশ্রুতি আসে প্রতিশ্রুতি যায়, মশা শুধু থেকে যায়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, মশা নিধন একটি বড় চ্যালেঞ্জিং কাজ। সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে মশা নিধন কার্যক্রম সম্ভব নয়। করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা ও সচেতনতা প্রয়োজন। আমাদের কর্মীরা নিয়মিত মশার ওষুধ দিচ্ছেন, পরিচ্ছন্ন কর্মীরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ম্যাজিস্ট্রেটরা অনেক ক্ষেত্রেই বাড়িতে বা ভবনে লার্ভা পেলে মোবাইল কোর্টে আর্থিক জরিমানা করছেন। তবুও মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
