গত শুক্রবার থেকে ধারাবাহিক ভূমিকম্পে শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত ও আহত হওয়ার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর এবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে গত শনিবার রাতে ১৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে সময় বন্ধ থাকবে আবাসিক হল ও ক্যান্টিন। গতকাল হলগুলোতে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বাড়িমুখী হতে দেখা গেছে।
তবে এক দিনের নোটিসে হলছাড়ার এই নির্দেশনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেক শিক্ষার্থী হল ছাড়তে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
গত শনিবার রাতে প্রভোস্ট কমিটির জরুরি সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৫টার মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে হল খালি করতে প্রভোস্ট নির্দেশ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা হল ছাড়ার সময় তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে রুমের চাবি হল প্রশাসনের কাছে জমা দেবেন। এ ছাড়া, প্রতিটি হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর ও বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে জানা গেছে, আবাসিক ভবনগুলোর কাঠামোগত ঝুঁকি নিরূপণে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। এ অবস্থায় দ্রুত হল খালি করে ভবনগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা পরীক্ষা শুরু করা হবে। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, ভূমিকম্পের আতঙ্ক কাটিয়ে স্বাভাবিক ক্যাম্পাস জীবনে ফিরতে হলে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে এই নির্দেশনার আগে প্রশাসন শুধু গতকাল রবিবারের ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করলেও শনিবার রাতের ভূমিকম্পে নতুন করে আরও ছয় শিক্ষার্থী আহত হওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। শামসুন্নাহার, কুয়েত মৈত্রী, রোকেয়া ও সূর্যসেন হলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আহত হন। শামসুন্নাহার হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ইসরাত জাহান সুমনার পা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা। আগের দিনও দুই হলে তিন শিক্ষার্থী আতঙ্কে লাফিয়ে নামতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন।
গত শুক্রবার সকালে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে কমপক্ষে ২২ শিক্ষার্থী আহত হন। মুহসিন হলে ৬ জন, জিয়া হলে ৩ জন, বিজয় ৭১ হলে ২ জন, জহুরুল হক হলে ২ জন, এফ আর হলে ২ জন, জসীম উদ্দীন হলে ২ জন এবং রোকেয়া, শামসুন্নাহার, কুয়েত মৈত্রী, সূর্যসেন ও এফ এইচ হলে একজন করে আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢামেকে ৩ জন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে আরও ৩ জন ভর্তি আছেন। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হলে বা নিজ বাসায় রয়েছেন। ডাকসুর স্বাস্থ্য সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত, আল্লাহর রহমতেই বড় বিপদ এড়ানো গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকে শিক্ষার্থীদের হলে হলে জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে। কেউ ব্যাগ-বই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে হল ত্যাগ করছেন, আবার কেউ শনিবার রাতেই নিরাপদ আবাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কিছু শিক্ষার্থী মনে করেন, হঠাৎ করে হল খালি করা স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি আবাসন সংকট ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সমস্যাকে সামনে এনে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা হওয়ার পর শনিবার রাতে কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। তারা বন্ধ ঘোষণা স্থগিত, হলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংস্কারের দৃশ্যমান পদক্ষেপসহ তিন দফা দাবি জানান। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু হল খালি করলেই আতঙ্কের সমাধান হবে না; নিরাপদ আবাসনের নিশ্চয়তা না থাকলে এ উদ্বেগ থেকেই যাবে।
সবশেষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ হলগুলোর অবস্থা মূল্যায়নে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ সদস্য ড. ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রকৌশল দল হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল পরিদর্শন করেছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জরুরি সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই পরিদর্শন চলছে এবং শিগগিরই অন্যান্য হলেও পর্যবেক্ষণ করা হবে। পূর্বের বুয়েটের দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, মুহসীন হলকে ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণার গুজব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পরিদর্শন শেষে কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে এবং ঝুঁকি পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের স্থানান্তর করা হবে। একই সঙ্গে চলমান সংস্কার কাজ ও ১৪৯ কোটি টাকার ভবন সংস্কার প্রকল্প ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হবে। এ ছাড়া ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নতুন হল নির্মাণ, ভবন সংস্কার, জলাধার পুনর্বাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নেও কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। সার্বিক বিষয়ে প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, খুবই দুঃখজনক এ রকম একটা ঘটনা ঘটেছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে সিদ্ধান্ত নেওযা হয়েছে। আমরা আসলেই এটা নিয়ে অনুতপ্ত যে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমরা আশা করি, যে প্রশাসনের কাজে শিক্ষার্থীরা সহযোগিতা করবে।
৭ দিন বন্ধ জবি, ৩০ নভেম্বর থেকে অনলাইনে ক্লাস : সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে সৃষ্ট আতঙ্ক ও সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস এবং পরীক্ষা আগামী সাত দিন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চলবে। এ সময় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও উন্মুক্ত লাইব্রেরি বন্ধ থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের পরিবহনসেবা স্থগিত থাকবে। তবে প্রশাসনিক অফিস নিয়মিত খোলা থাকবে। গতকাল রবিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে আয়োজিত এক জরুরি সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউট পরিচালক, রেজিস্ট্রার, বিভাগীয় চেয়ারপারসন, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং প্রক্টর উপস্থিত ছিলেন। সভায় ভূমিকম্প-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকি নিরূপণের স্বার্থে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র আবাসিক নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছাত্রী হল সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের ভবনগুলো ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের ডিনকে আহ্বায়ক করে বুয়েটের বিশেষজ্ঞসহ একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ভবনগুলো পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর ৪ ডিসেম্বর আবার সভা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্ববিদ্যালয়।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিতে বিশেষ পরিবহনব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের বাসগুলো আজ সকাল থেকে বিভাগীয় শহরগুলোয় শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেবে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক ড. তারেক বিন আতিক। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন প্রসঙ্গেও সভায় আলোচনা হয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সবার সঙ্গে আলোচনা করে আজ সোমবার সিদ্ধান্ত নেবে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত সবার সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া হবে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হবে।’
