রাজধানীর মহাখালী কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড হয়েছে। অল্প সময়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বস্তির কয়েকটি স্থানে। আগুন বেশ বড় আকারে রূপ নিয়েছে। ক্রমেই চার পাশে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। পানির অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট সোয়া পাঁচ ঘণ্টা কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে রাত ১০.৩৫ মিনিটে।
তীব্র যানজট ঠেলে ফায়ারের ইউনিটগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর আগুন নেভানোর কাজ শুরু করলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় অসংখ্য ঘর ও বস্তির নিম্ন আয়ের মানুষের সবকিছু। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সর্বস্ব হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের অভিযোগ, বারবার কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটছে। এসব আগুন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটি পক্ষ বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।
জানা গেছে, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর থেকে এ নিয়ে কড়াইল বস্তিতে তিনবার অগ্নিকান্ড ঘটেছে। এর আগেও বহুবার এই বস্তিতে আগুন লেগেছে। বারবার আগুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বস্তিবাসী। এবারের আগুনেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এর সূত্রপাত সম্পর্কে নিশ্চিত করতে পারেনি বস্তিবাসী। ফায়ার সার্ভিসও বলছে, তদন্ত করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও আগুন লাগার কারণ নির্ণয় করা হবে। আগুন নেভাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন আহত হলেও বড় ধরনের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালিদ বলেন, আগুন লাগার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে ১১টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। পর্যায়ক্রমে আরও আটটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। যানজটের কারণে গাড়ি আটকা পড়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাঁশ-কাঠ আর টিন দিয়ে তৈরি কড়াইল বস্তিতে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। ঘরগুলো খোপ খোপ সিস্টেমের। প্রতিটি ঘর আবার দোতলা সিস্টেমের। এখানকার বাসিন্দারা কেউ রিকশাচালক ও কেউ দিনমজুর। কেউবা বুয়ার কাজ করে জীবনযাপন করেন। আগুনে তাদের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে বহু মানুষের জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের পাশেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বস্তির বাসিন্দা লাভলী বেগম।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ও ভাই আমার সব পুইড়া শ্যাষ, কিচ্ছু নেই। সাত বছর ধরে এই বস্তিতে আছি। অনেক কষ্টে তিল তিল করে জিনিসপত্র কিনেছিলাম। ঘরে টিভি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কিনেছিলাম। মাসে মাসে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হয়। এ আগুন আমার সব শ্যাষ করে দিল।’
বস্তির বাসিন্দা গার্মেন্টসকর্মী নাসিমা বেগম, ‘বোনের ফোনে খবর পেয়ে দ্রুত বস্তিতে ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। শুনেছি আমার ঘর পুড়ে গেছে, সব জিনিস শেষ হয়ে গেছে। এখন কীভাবে কী করব, বুঝতে পারছি না।’
লোকমান নামের একজন মাথায় টেলিভিশন ও হাতে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে বের হন। তিনি বলেন, ‘এই দুইডা জিনিস বাহির করতে পেরেছি। বাকিসব পুইড়া গেছে। চোখের সামনে সব পুড়ে গেল।’
স্কুলপড়ুয়া শিশু ইয়াহিয়া, তার কাঁধে একটি বড় বস্তা। সঙ্গে তার মা লিমা আক্তার দুই হাতে দুটি বড় ব্যাগ নিয়ে বের হন। হাসানের বাবা বাইরে কাজে থাকায় মা-ছেলে যতটুকু পারে, জিনিসপত্র উদ্ধার করেন।
লিমা আক্তার বলেন, ‘কিছুই বের করতে পারিনি। আমাদের ঘরেই আগুন লেগেছে। ছয় বছর ধরে বস্তিতে থাকি, দুবার আগুনের শিকার হয়েছি। আগেরবার খুব বেশি ক্ষতি হয়নি, কিন্তু এবার দামি আসবাবপত্র সব পুড়ে গেছে।’
যানজটে আটকা, পানি সংকটে বেগ : বস্তির সরু গলিতে যানজটের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের। বস্তির ওয়ালভাঙা বউবাজার রোড থেকে বেলতলা রোড পর্যন্ত পুরো সড়কে পিকআপের যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ওই সড়ক দিয়ে আসা ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী কোনো গাড়ি আগুনের স্থানে পৌঁছাতে পারেনি। যানজটের কারণে ফায়ার ফাইটাররা বিকল্পভাবে পানির পাইপ ও জেনারেটর টেনে পানি দেন। তবে এই পানিতে আগুন কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। একটা পর্যায়ে তীব্র যানজট ঠেলে ফায়ারের ইউনিটগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর আগুন নেভানোর কাজ শুরু করলেও, পানির অপ্রতুলতার কারণে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছিল না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বস্তির ওয়ালভাঙা বউবাজার রোড থেকে বেলতলা রোড পর্যন্ত পুরো সড়কে পিকআপের দীর্ঘ সারি। এতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো এসে বেলতলা মোড়ে আটকে রয়েছে। অন্যদিকে মুসার বাজার থেকে কাপড়পট্টি সড়ক দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কিছু গাড়ি এসে পানি ছিটাচ্ছে। বস্তিবাসীর অভিযোগ, বস্তির চিপা সড়কে যদি পিকআপ গাড়ি না ঢুকত, তাহলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে অনেক আগেই আগুন নেভাতে পারত।
ফায়ার ফাইটাররা জানান, যানজটের কারণে পানির গাড়ি অনেক দূরে আটকা পড়ে। যে গাড়িগুলো কাছাকাছি আসতে পেরেছিল, সেগুলোর পানি শেষ হয়ে যায়। এ কারণে খাল থেকে জেনারেটর লাগিয়ে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। খালের পাড়ে তিনটি জেনারেটর লাগানো হয়। তিনটি জেনারেটর দিয়ে একাধিক পাইপ লাগিয়ে পানি ছিটানো হয়।
আকবর হোসেন নামের বস্তির একজন বাসিন্দা জানান, আগুন লাগার প্রায় ৩০ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসে। কিন্তু সব গাড়ি আগুনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। রাস্তায় যানজটের কারণে সব গাড়ি আটকে যায়। দূর থেকে পাইপ টেনে পানি দেন ফায়ার সার্ভিসের লোকজন।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালিদ বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পানিসংকটের কারণে পানিসহ আরও কয়েকটি ইউনিট পাঠানো হয়। পানিসংকটের কারণেই আমরা ইউনিট বাড়িয়ে ১৬টি করেছি। আমাদের কর্মীদের সর্বোচ্চ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।’
আতঙ্কিত বস্তিবাসী, পুলিশ মোতায়েন : বস্তির বাসিন্দারা জানান, আগুন লাগার পর দাউ দাউ করে তা টিনের ঘরগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত মানুষজন যে যেভাবে পারছেন, ঘর থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র সরিয়ে নেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ বস্তির বাসিন্দাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা দুর্ঘটনা না ঘটে। তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ঘটনাস্থল থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন।
এ সময় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বস্তিটির মাঝ বরাবর অংশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। গুলশান-১-এর লেক বরাবর অংশের প্রায় পুরোটাতেই আগুন জ্বলে। আস্তে আস্তে এই আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে। একদিক থেকে আগুন ধেয়ে আসছে, অন্যদিকের বাসিন্দারা যে যার মতো আসবাবপত্র, টিভি, ফ্রিজ, পোশাক, হাঁড়ি-পাতিলসহ অন্য মালামাল সরিয়ে নেন। কেউ কাভার্ড ভ্যানে করে, ভ্যানগাড়িতে করে আবার কেউ কেউ ঘাড়ে করে এসব মালামাল নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। তাদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ ও আর্তনাদ। কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে নিতে গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে কেউ কেউ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা বলেন, ‘আর কতবার আগুন লাগবে এই বস্তিতে। প্রতিবছর দুবার করে আগুন লাগে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একবার লেগেছিল। তখন ৬১টি ঘর পুড়ে গেছে।’
আশপাশের সড়কে ক্ষতিগ্রস্তদের অবস্থান : সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মহাখালীসহ আশপাশের সড়কে বস্তির বাসিন্দারা অবস্থান নিয়েছেন। ছোট বাচ্চাদের মালামালের কাছে বসিয়ে রেখে অভিভাবকরা বস্তিতে গিয়ে যা উদ্ধার করতে পারছেন, তা নিয়ে আসছেন। পুরো রাস্তায় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের পাশাপাশি উৎসুক মানুষের কোলাহল। উৎসুক জনতাকে কোনোভাবে নিবৃত্ত করতে পারছিল না পুলিশ ও র্যাব। তবে উৎসুক জনতাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ আবার বস্তিবাসীর সহায়তায় এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। আগুনের ভয়াবহতা বেড়ে গেলে বাসিন্দাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। কেননা, তখন বস্তির ভেতর প্রবেশ করলে ঝুঁকি রয়েছে। যে কেউ আগুনে দগ্ধ হতে পারে। তাই নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বস্তিবাসী সেখানে ভিড় করেন। তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুড়ে যাওয়া মালামালের মধ্যে অবশিষ্ট কিছু আছে কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। নিজ ভিটায় গিয়ে আক্ষেপ করেন।
অল্প সময়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে : দেখা গেছে, আগুন লাগার পরপর অল্প সময়ের মধ্যে আগুন চারদিক ছড়িয়ে পড়ে। কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় ওখানকার আকাশ। আগুনের তীব্রতা এতটা বেশি ছিল যে, আশপাশ থেকে এর তাপ শরীরকে স্পর্শ করছিল। আগুনের তাপে কাছে ভেড়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। এদিকে ভয়াবহ এই আগুনের ফলে ওখানকার অনেক সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেখা দেয় তীব্র যানজট। মহাখালী, গুলশান-১-সহ আশপাশের সড়কে দীর্ঘক্ষণ আটকা পড়েন ঘরমুখী মানুষকে। তবে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় আস্তে আস্তে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন : ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর অনেকেই এক কাপড়ে কোনো মতে জীবন রক্ষা করে নিরাপদ স্থানে চলে যান। অধিকাংশ বাসিন্দাই জামা-কাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করতে পারেননি। এমনকি নিম্ন আয়ের এসব মানুষের ঢাকায় অন্যত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নেই। কী খাবেন, কী পরবেন, সেই চিন্তা তাদের। যাদের ঘরগুলো পুড়ে গেছে, তারা খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নেন। রাতটুকু কোনো রকম সেখানেই কাটান। কোনো স্বজনের বাসায় যে আশ্রয় নেবেন, সেই সুযোগও নেই বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দার।
১১ মাসে তিনবার আগুন : এ নিয়ে ১১ মাসে এই বস্তিতে তিনবার আগুন লেগেছে। এর আগে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি বস্তিতে আগুন লাগে। তখন ৬১টি ঘর পুড়ে যায়। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর আগুন লাগে। তখনো বেশ কয়েকটি ঘর পুড়ে গেছে। শুধু এই তিনবারই নয়; এর আগেও বহুবার এই বস্তিতে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই শত শত ঘর আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে বস্তির নিম্নআয়ের বাসিন্দাদের। তবে বরাবরই বস্তিবাসীর অভিযোগ, তাদের উচ্ছেদ করতে এই আগুন দেওয়া হচ্ছে। বারবার এমন আগুনে আতঙ্ক বিরাজ করছে বস্তিবাসীর মধ্যে।
