কড়াইল বস্তির ভয়াবহ আগুনে সব হারিয়ে হাজারো মানুষ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে। সবাই জীবন বাঁচাতে এক কাপড়েই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। অসহায় অবস্থায় আছেন বস্তির বাসিন্দারা। নেই রান্নার ব্যবস্থা, খাওয়া দাওয়ার ঠিকানা, রাতে ঘুমের স্থান ও শীতে গরম কাপড়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট রয়েছে খাবার ও গরম কাপড়ের। শীত ও ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয় শিশু ও বৃদ্ধসহ হাজারো মানুষ। বস্তির ধ্বংসস্তূপের আশপাশে ত্রিপল আর ছেঁড়া কাপড় বিছিয়ে কোনোরকমে রাতযাপন করে অধিকাংশরা।
জানা গেছে, অগ্নিকা-ের পর পরই ডিএনসিসির প্রশাসক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সে অনুযায়ী ঢাকা জেলা প্রশাসন, ডিএনসিসি, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন এনজিওর সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সমন্বয় সভা করার কথাও বলছেন। এ সভায় মন্ত্রণালয়কে তাৎক্ষণিক খাবার ও গরম কাপড় সহায়তা দেওয়ার আহ্বানও জানানো হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরে রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি উদ্যোগে খাদ্য সহায়তা দিতে দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, এই অগ্নিকান্ডে ১ হাজার ৫০০ ঘর পুড়ে গেছে। তবে বস্তির বাসিন্দারা বলছে ২ হাজার ঘর পুড়েছে, যেখানে ৫ হাজার পরিবার বসবাস করেন। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২০-২৫ হাজার মানুষ। অগ্নিকান্ডে বিপুলসংখ্যক ঘর পুড়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগুনের তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার ৪০ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে জানিয়ে নিলুফা আক্তার নামে এক বাসিন্দা বলেন, বস্তিতে কী কারণে আগুন লেগেছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে আগুন মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সবাই নিজের জীবন বাঁচাতেই দৌড়ে চলে যান। কিন্তু আগুন নেভাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। আবার আগুন নেভাতে পানির ব্যবস্থাও ছিল না।
রাতে আগুন লাগার পর ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারিনি। রাতের খাবারটা বিকেলেই রান্না করে রাখা হয়েছিল। সে খাবারটাও ছাই হয়ে গেছে। পকেটে টাকা না থাকায় রাতে খাবারও কিনতে পারিনি। তবে মধ্যরাতে বস্তিবাসীর মাঝে খাবার বিতরণ করেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তখন তিন প্যাকেট খিচুড়ি পেয়েছি। এগুলোই আমরা পাঁচজনে খেয়ে রাত পার করেছি। এখন কী খাব তা বুঝে উঠতে পারছি না। রাস্তায় কারও কাছে সাহায্যও চাইতে পারছি না। অথচ পাশেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নগর ভবন। তারা তেমন কোনো সহযোগিতা করছে না।
তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই অনেকে ফায়ার সার্ভিসের টেলিফোন নম্বরে কল দিয়েছে। কিন্তু তারা প্রায় ৪০ মিনিট পর বস্তিতে এসেছে। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মহাখালী এলাকায় কড়াইলসহ বেশ কয়েকটি বস্তি আছে। অথচ এখানে কোনো ফায়ার স্টেশন নেই।
যদিও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে যেতে দেরি হওয়ার কারণ জানিয়েছে সংস্থাটি। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যানস) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম গত মঙ্গলবার রাতে কড়াইল বস্তিতে গিয়ে বলেছেন, দ্রুত পৌঁছাতে পারলে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যেত। কিন্তু সড়কে যানজটের কারণে আমাদের প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ৩৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে। এরপর একে একে ইউনিট আসতে আরও সময় লাগে। ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়িগুলো শুরুতে আগুনের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ খান বলেন, এলপিজি গ্যাস যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে। বস্তির ঘরগুলো খুব ঘিঞ্জি, একটার সঙ্গে আরেকটা লাগানো। ঘরগুলো কাঠ ও টিন আর কাগজের বক্স দিয়ে বানানো। যা দাহ্যবস্তু। ইলেকট্রনিক লাইনগুলো অনেক নিম্নমানের। রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের সিলিন্ডারগুলোয় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, বস্তিতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য আগুন লাগাতে পারে। সেটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক কারণেও আগুন লাগানো হতে পারে। গোয়েন্দারা ভালো বলতে পারবেন।
প্রধান উপদেষ্টার উদ্বেগ ও সমবেদনা : রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে বিপুলসংখ্যক ঘর পুড়ে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি এ ঘটনায় আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো এক বার্তায় ড. ইউনূস বলেন, কড়াইল বস্তির অগ্নিকান্ডে যেসব পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট আমাদের সবার জন্য বেদনার। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অগ্নিকা-ের কারণ অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কড়াইল বস্তির আগুনের ঘটনায় ৫ সদস্যের কমিটি গঠন : অগ্নিকান্ডের তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক (অপা. ও মেইন.) মো. মামুনুর রশিদকে সভাপতি করে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান, সদস্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা জোন-২ এর উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা, সিনিয়র স্টেশন অফিসার তেজগাঁও মো. নাজিম উদ্দিন ও ঢাকা-২৩ এর ওয়্যার হাউজ ইন্সপেক্টর মো. সোহরাব হোসেন।
আগুনের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় : কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আগুনে ক্ষয়ক্ষতি দেখতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভিড় করছেন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা উৎসুক মানুষ। এর ফলে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি, নিরাপত্তা ও সহায়তা কার্যক্রম চালাতে আসা ব্যক্তিরা নিজেদের কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। উৎসুক জনতার অযথা ভিড়, ফটো-ভিডিওগ্রাফিতে বস্তির ভেতরের সরু রাস্তায় চলাচলে লম্বা ভিড় লেগে আছে। উদ্ধার ও সহায়তাকর্মীরা বলছেন, মানুষের ঢল ক্ষতিগ্রস্তদের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাখালীর খামারবাড়ী মাঠ থেকে শুরু করে বউবাজার ঘাট পর্যন্ত মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি দেখছে। কারও হাতে মোবাইল, কেউ লাইভ করছে, আবার কেউ ভিডিও করে সামাজিকমাধ্যমে আপলোড করছে। এই ভিড়ের কারণে মূল প্রবেশপথ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি উদ্যোগে খাদ্য সহায়তা : বস্তির সকলেই নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ রিকশা চালিয়ে সংসার চালান, কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করে, কেউবা দিনমজুরের কাজ করেন। এ ছাড়া আগুনে বাসায় থাকায় চাল-ডাল থেকে শুরু করে সবই পুড়ে গেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খাদ্যাভাবে ভুগছেন। এ অবস্থায় কিছুটা হলেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের পক্ষ থেকে খিচুড়ির প্যাকেট দেওয়া হচ্ছে। পারটেক্স গ্রুপের পক্ষ থেকে খাবার পানি ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও খাবার বিতরণ করেন। সহকর্মীদের নিয়ে খিচুড়ি বিতরণ করেন ল্যান্ড মার্ক গ্রুপের সিইও বিএম সাইফুদ্দিন। এ ছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে আরও অনেককে খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে। অসহায় বস্তিবাসীর এই খাবারই একমাত্র বেঁচে থাকার সম্বল। দেখা যায়, ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামানের ব্যানারে পোড়া বস্তির দুই স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প বসানো হয়েছে। সেখানে বস্তির আহত বাসিন্দাদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন কয়েকজন চিকিৎসক। জরুরি ওষুধও সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তর, ব্র্যাক ও বেশ কয়েকটি এনজিও কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের তালিকা সংগ্রহ করেন।
