কাটছে না ভূমিকম্প আতঙ্ক। শুক্রবারের ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত চার দফা ভূমিকম্প হলো। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে নরসিংদীতে ৩ দশমিক ৬ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প এই আতঙ্ককে বাড়িয়ে দিয়েছে আরও কয়েকগুণ। এর আগে একই দিন বঙ্গোপসাগরে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে বুধবার ভোর ৫টায় ৪ রিখটার স্কেলের আরও একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল। অপরদিকে শুক্রবারের ভূমিকম্পটি জাপানের হিরোশিমার প্রায় অর্ধেক শক্তি বের করেছিল (১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় আঘাত করা অ্যাটম বোমাটি প্রায় ১৩ কিলোটন টিএনটির বিস্ফোরণের সমান)।
তবে এসব ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল বিকেলে নরসিংদীতে যে ভূমিকম্প হয়েছে তা আগের ভূমিকম্পের এলাকায়। তাই এটাকে নতুন কোনো ভূমিকম্প বলার সুযোগ নেই।
তবে একই দিন বঙ্গোপসাগর ও সিলেটের উত্তর-পূর্বে ভারতীয় অংশে যে দুটি ভূমিকম্প হয়েছে সেগুলো পৃথক ভূমিকম্প বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভারতীয় সিসমোলজি সেন্টার থেকে প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যায়, গতকাল বিকেলে নরসিংদীতে উৎপত্তি হওয়া ৩ দশমিক ৬ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি ঘোড়াশাল এলাকায়। মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পটির কারণে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় কেঁপে ওঠে।
শুক্রবারের ভূমিকম্পটি হিরোশিমার বোমার অর্ধেক শক্তির ছিল : ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি কত শক্তির ছিল? এ ছাড়া পরে চার আফটার শকে কী পরিমাণ শক্তি মাটির ভেতর থেকে বের হয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে ড. মো. জিল্লুর রহমান, শুক্রবারের ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি প্রায় ২.৮ী১০^১৩ জুলস (জুল হলো শক্তির একক) ছিল, যা জাপানের হিরোশিমায় আঘাত করা অ্যাটম বোমার অর্ধেক শক্তির (প্রায় ১৩ কিলোটন টিএনটির বিস্ফোরণের সমান)।
তাহলে পরবর্তী সময়ে যে ৩.৭ রিখটার স্কেলের দুটি, ৪ দশমিক ৩ রিখটার স্কেলের একটি এবং সর্বশেষ ৩ দশমিক ৬ রিখটার স্কেলের একটি ভূমিকম্প হলো সেগুলোতে কি পরিমাণ শক্তি বের হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ড. জিল্লুর রহমান বলেন, রিখটার স্কেলে এক মাত্রা কমলে ৩২ গুণ শক্তি কমে যায়। সে হিসেবে যেহেতু রিখটার স্কেলের মাত্রা কমছে তাই ভেতরের শক্তি ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছে এবং এগুলো আফটার শক।
২ মাস পর্যন্ত আফটার শক হয়ে থাকে : ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের কারণে এ পর্যন্ত চার দফা ভূমিকম্প হলো। গত শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিট ১২ সেকেন্ডে ৩ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের, একই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট ৪ সেকেন্ডে ৩ দশমিক ৭, এর এক সেকেন্ড পরে একই স্থানে ৪ দশমিক ৩ রিখটার স্কেলের আরও একটি ভূমিকম্প হয়েছে। পরে গতকাল বিকেলে হলো ৩ দশমিক ৬ রিখটার স্কেলের। এসব ভূমিকম্পগুলোকে আফটার শক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এই আফটার শক কতদিন চলবে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বর্তমানে আমেরিকায় পিএইডি গবেষণারত বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভূ-তত্ত্ব) আখতারুল আহসান বলেন, ‘১৯৫০ সালে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ৮ দশমিক ৬ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর পরবর্তী সময়ে ২ মাস পর্যন্ত আফটার শক ভূমিকম্প হয়েছে।’
তাহলে কি নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পরও এমন আফটার শক দুই মাস পর্যন্ত থাকতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত কোনো এলাকায় একটি বড় ভূমিকম্প হলে একই এলাকায় পর পর অনেকগুলো আফটার শক হতে পারে। নরসিংদীর ক্ষেত্রেও এমনটাই হচ্ছে। তাই এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
একই মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের অপর এক উপ-পরিচালক (ভূ-তত্ত্ব¡) মাহমুদ হোসেন খান। তিনি নরসিংদীর ভূমিকম্পের ফাটল পরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যেহেতু পরের ভূমিকম্পগুলো শুক্রবারের ভূমিকম্পের চেয়ে ছোটো মাত্রার তাই এগুলো যে আফটার শক তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এ ছাড়া ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থলও একই গভীরতায়।
নরসিংদীর ফাটল ফল্ট লাইনের কারণে ছিল না : নরসিংদীতে গত শুক্রবারের ভূমিকম্পে যে ফাটল দেখা দিয়েছিল সেই ফাটল ফল্ট লাইনের কারণে ছিল না বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বি¡ক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভূ-তত্ত্ব¡বিদ) মাহমুদ হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘আমরা নরসিংদীতে যে ফাটল পেয়েছি সেগুলোর গভীরতা ছিল ৪০ থেকে ৪২ সেন্টিমিটার এবং চওড়া ছিল ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত।’
তবে এই ফাটলের সঙ্গে মাটির গভীরের ফল্ট লাইনের কোনো সংযুক্তি ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ফাটলগুলো হয়েছে নরম মাটিতে। এর পাশেই ছিল খাল বা জলাধার। ভূমিকম্পের কম্পনে মাটি কেঁপে পাশের জলাধারের পানির প্রভাবে (লিকুইফিকেশন) মাটি সরে গিয়ে ফাটল তৈরি হয়। নরসিংদী এলাকায় যতগুলো অংশের মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে সবগুলোতেই একই চিত্র।
আতঙ্কের পরিবর্তে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ জরুরি : ভূমিকম্প একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পৃথিবীতে প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার বার ভূমিকম্প হয়ে থাকে। এ বিষয়ে প্রফেসর ড. জিল্লুর রহমান বলেন, আগে এমন ছোটোখাটো মাত্রার ভূমিকম্পগুলোও আমরা জানতে পারছি গুগল অ্যালার্টের মাধ্যমে। এসব ভূমিকম্প হবেই, এগুলো নিয়ে আতঙ্ক নয়। প্রয়োজন হলো ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ করা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে আর্থকোয়েক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর তা বিবেচনা করেই কিন্তু ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড প্রণয়ন করা হয়েছে। আমরা যদি ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করি, তাহলে ভূমিকম্পে ঝুঁকির মাত্রা কমে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান নগরগুলোর নতুন নতুন ভবনগুলো ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নমুনা কম। পুরনো ভবনগুলো কিংবা যেসব ভবন প্রকৌশলী ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্লেট বাউন্ডারির কারণে ঝুঁকি বেশি চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল : চট্টগ্রাম ও সিলেট স্বাভাবিকভাবেই ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার (বার্মা) সীমান্তের পাশ দিয়ে একটি ফল্ট লাইন (প্লেট বাউন্ডারির সঙ্গে যুক্ত কোনো লাইন বা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় কোনো চ্যুতি) রয়েছে। আর এই ফল্ট লাইনটি আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত এবং বাংলাদেশ ভারত সীমান্তের ত্রিপুরা, বিহার, মেঘালয়, শিলং হয়ে হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই এলাকায় ভূমিকম্প বেশি উৎপত্তি হয়ে থাকে এবং তা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্র্ণ।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশের পূর্ব পাশ দিয়ে ইন্দো-অস্ট্রেলিয়া প্লেট বাউন্ডারি ও বার্মায় একটি ছোট প্লেট বাউন্ডারি রয়েছে। দেশের প্রান্তসীমায় যেসব ভূমিকম্প উৎপত্তি লাভ করছে সেগুলো প্লেট বাউন্ডারি বরাবর। তাই চট্টগ্রাম ও সিলেট জোন অনেকটা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে।
উল্লেখ্য, সারা বিশ্বে প্রতিবছর দুই হাজার বার ভূমিকম্প হয়। এদের মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। ছোট-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত পৃথিবী প্রতিনিয়ত গতিতে থাকার কারণে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। ইন্ডিয়া ও বার্মা প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই টেকনাফ থেকে নেপাল পর্যন্ত হিমালয়ান পর্বতমালা গঠিত হয়েছিল। দেশে ২০২১ থেকে এ পর্যন্ত ২১৫টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। এরমধ্যে ২০২৫ সালেই হয়েছে ৮০টি। গত চার বছরের ২১৫টি ভূমিকম্পের মধ্যে দেশের ভেতরে উৎপত্তি হয়েছে ৪২টির। এসব ভূমিকম্পের প্রায় সবগুলোই মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছে। এরমধ্যে গত শুক্রবারের ভূমিকম্পটি ছিল সবচেয়ে বড় মাত্রার (৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেল)। এতে ঢাকা শহরে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।
