বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি বরাবরই এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে শিক্ষার্থীরাই জাতিকে পথ দেখিয়েছে, সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে। ছাত্ররাজনীতিই দেশের সব বাধা বিপত্তি উপড়ে ফেলার প্রথম শক্তি। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান চর্চার স্থান হিসেবে সীমিত নয়, বরং এখান থেকেই দেশের প্রতিটি বড় আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ক্যাম্পাস থেকেই রাজনীতি ও দেশের নেতৃত্বের গুণাবলি শিখতে প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসে প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, যা শিক্ষার্থীদের রাজনীতি সচেতন করে তুলতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
ইতিমধ্যেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ২৪ ডিসেম্বর। এই নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যাপক আগ্রহ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটাই প্রথম জকসু নির্বাচন হওয়ায় প্রত্যাশার মাত্রা একটু বেশিই। শিক্ষার্থীরা জকসুকে নিজেদের বিকল্প কণ্ঠস্বর হিসেবে ভাবছে। ফলে সব জবিয়ানদের আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে এখন জকসু নির্বাচন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এর সংকট অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশিই বলা চলে। প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে এসেও বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেনি। যা মূলত প্রত্যেক জবিয়ানের অন্যতম স্বপ্ন। দিনের পর দিন আন্দোলন সংগ্রামে লড়াই করে যাওয়া জবিয়ানের স্বপ্ন বিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থা। তাই জকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতি প্রথমেই যে প্রত্যাশা থাকবে তা হলো ২০১৬ সালে বরাদ্দ দেওয়া কেরানীগঞ্জে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস দ্রুত সম্পন্ন করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন মানে দলমত নির্বিশেষে এমন একটি প্যানেল, যা শিক্ষার্থীদের হয়ে কাজ করবে, সবার অধিকার রক্ষায় মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। সে পরিস্থিতি থেকে জকসু প্রার্থীদের প্রতি জবিয়ানদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে।
ছাত্র কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ : জকসুর বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজ ও চিন্তায় পরিবর্তন আনা। যেমন শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাইরের প্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন কাজের সহায়তা করে দেওয়া। ছাত্র সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখা।
প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবন উৎসাহে প্রতিযোগিতা : জকসুর নেতৃত্বকে এমন হতে হবে, যারা ছাত্রছাত্রীদের সামনে বিকল্প স্বপ্ন তুলে ধরবেন। শুধু সরকারি চাকরিই লক্ষ্য নয় বরং জ্ঞান সৃষ্টি, কর্মসংস্থান, সামাজিক উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পথ তৈরি করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকে লালন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই পড়াশোনার পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনে উৎসাহ দেয় এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে এমনটাই জবিয়ানদের প্রত্যাশা।
ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যকার সেতুবন্ধন হবেন তারা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা শুধু আন্দোলনেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিদিনের বাস্তবতায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন। যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জবাবদিহিতায় আনতে সক্ষম হবেন, শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের আস্থা গড়ে তুলতে পারবেন। এক কথায় তারা হবেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যকার সেতুবন্ধন। শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে তারা জবিয়ানদের বিশ্বমঞ্চে অবদান রাখার পথ সুগম করবেন। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে পারবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার প্রয়াস চালাতে পারবেন।
দলের অন্ধ আনুগত্য নয় : জকসু নেতৃত্বের কাজ হবে কোনো দল বা ক্ষমতাসীন জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নগ্ন প্রদর্শন না করা, আবার একই সঙ্গে রাজনীতির প্রতি অনীহামূলক মনোভাবও না দেখানো। ছাত্রনেতাদের ভূমিকা হতে পারে, জনমত গঠন ও কল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ প্রয়োগকারী প্রভাবকের মতো। নির্বাচিত জকসু নেতৃত্ব কর্র্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের কথা অকপটে তুলে ধরবেন-এমনটাই প্রত্যাশা জবিয়ানদের।
গড়তে হবে শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস : জকসু নেতৃত্বকে সৃজনশীল ও বাস্তববাদী হতে হবে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন সংকটগুলো বুঝে সমাধান করার সক্ষমতা থাকতে হবে। আমাদের ক্যাফেটেরিয়া, মেডিকেল সেন্টারসহ সব জায়গায় মনিটরিং সিস্টেম চালু করতে হবে, যেন শিক্ষার্থীদের জন্য সুব্যবস্থা থাকে। লাইব্রেরিকে আধুনিকায়ন করা জকসু নেতৃত্বের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়াও আমাদের একাডেমিক ভবনগুলোর পলেস্তারা মাঝে মাঝেই খসে পড়ে, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে চলেছে। আর ভবনগুলোর মেয়াদ না থাকায় ভূমিকম্পের আতঙ্ক তো আছেই। তাই ভবনগুলোর সংস্কার কাজ চালানোর জন্য প্রশাসনের সঙ্গে আলাপচারিতা করে শিক্ষার্থীবান্ধব ফলাফল আনার মাধ্যমে তারা একটি শিক্ষার্থীবান্ধব নিরাপদ ক্যাম্পাস তৈরি করবেন সেটিই প্রত্যাশা।
আমরা জবিয়ানরা চাই, আমাদের প্রাণের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জকসু হবে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে। জকসু হোক এমন এক পাটাতন, যার কোনো রাজনৈতিক ব্যানার না থাকলেও, থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অকুণ্ঠ সমর্থন। আমাদের দুর্দশাগুলো জকসুর মাধ্যমেই প্রশাসন ও জকসুর পারস্পরিকতায় সমাধান হবে এই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
